বিশ্বকাপ ফুটবলের সমাপ্তি ঘনিয়ে এলেও তার আবহ থেকে যাচ্ছে অমলিন। ট্রফি জিতে উঠছে একটি দল, কিন্তু আনন্দ-উল্লাসে শামিল হচ্ছে কোটি কোটি মানুষ, যারা বিশ্বকাপের মূল আসরে নিজেদের দেশের পতাকা উড়াতে পারেনি। বাংলাদেশ ঠিক এমনই একটি দেশ, যেখানকার ফুটবল প্রেম বিশ্বব্যাপী পরিচিত। রাজধানীর টিএসসি এলাকায় বড় পর্দায় বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে জড়ো হন হাজার হাজার সমর্থক। লিওনেল মেসি গোল করলে সেখানে যে আবহ তৈরি হয়, তা যেন বুয়েনস এইরেসের কোনো চত্বরের কথা মনে করিয়ে দেয়। নীল-সাদা জার্সি পরে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন তারা, যদিও দেশের নাম বিশ্বকাপের দলগুলোর তালিকায় নেই।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর মানুষও বিশ্বকাপকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করে। বিবিসির এক গবেষণা জানায়, বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে মাত্র দুটি—যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল—এই বিশ্বকাপে খেলছে। অন্যদিকে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে পা রাখতে পারেনি। চীন ও ইন্দোনেশিয়া মাত্র একবার করে খেলেছে। এ জনসংখ্যার বিপুল অংশ ফুটবলের বাইরে। জনসংখ্যা ফুটবল সাফল্যের একমাত্র শর্ত নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ স্টেফান শিমানস্কি বলেছেন, বড় জনসংখ্যা সম্ভাবনা তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু তা কাজে লাগাতে প্রয়োজন মানসম্মত একাডেমি, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ। তার ভাষায়, ফুটবলে দক্ষতা অর্জনে অর্থনীতির মতো শুধু মানবসম্পদ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই সম্পদের সঠিক বিকাশ।
অনেকে মনে করেন, ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা ফুটবলের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক পরিবারগুলোকে ফুটবলের বদলে ক্রিকেট বেছে নিতে উৎসাহিত করে। তবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ দেখায়, ক্রিকেটের পাশাপাশি বিশ্বকাপ ফুটবলেও সাফল্য সম্ভব। সেক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাবকেই মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। চীন বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি। অন্যদিকে মরক্কো দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছায়। দক্ষিণ কোরিয়াও এশিয়ান ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে পরিকল্পিত উদ্যোগে।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই উদাহরণগুলো যেমন প্রেরণাদায়ক, তেমনি বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশ্বকাপের ট্রফি এখনো নাগালের বাইরে থাকলেও উৎসবের আনন্দ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেন না বাংলাদেশিরা। বড় পর্দার সামনে আবারও জমবে ভিড়, কেউ মেসির গোল স্মরণ করবে, কেউ এমবাপ্পের উড়ানের গল্প বলবে। আর সেই উচ্ছ্বাসের মাঝে গোপনে বেঁচে থাকবে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন। এই স্বপ্নই সম্ভবত বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি।




