প্রযুক্তির নীরব বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ইন্টারনেট দিবস। ১৯৯১ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডের সার্ন গবেষণা কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি তাঁর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব প্রকল্পটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এর আগে ইন্টারনেট মূলত কম্পিউটারগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু বার্নার্স-লির উদ্ভাবনেই জন্ম নেয় ওয়েবসাইটের ধারণা, যা তথ্য আদান-প্রদানের পথকে বহুলাংশে সহজ করে তোলে। ১৯৮৯ সালের ১২ মার্চ এই ওয়েবের প্রস্তাব প্রথম দেন তিনি। উল্লেখ্য, তাঁর তৈরি প্রথম ওয়েবসাইটের লিংক (http://info.cern.ch/) আজও সচল রয়েছে। ১৯৯৩ সালে সার্ন কর্তৃপক্ষ ওয়েব ব্যবহারকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেয়, যা এই প্রযুক্তির প্রসারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। বার্নার্স-লির হাত ধরেই তৈরি হয় প্রথম ব্রাউজার, যার নাম ছিল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব; এটি পরবর্তীকালে নেক্সটস্টেপ অপারেটিং সিস্টেমে পরিচালিত হতো। গুগলের অনেক আগেই, ১৯৯০ সালে, মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অ্যালান এমটেজ প্রথম সার্চ ইঞ্জিন 'আর্চি' নির্মাণ করেন। সামাজিক যোগাযোগের ইতিহাস বলছে, ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পরিচালিত সিক্সডিগ্রিস ডটকম-ই ছিল প্রথম সামাজিক মাধ্যম, যেখানে বাস্তব নামে প্রোফাইল ও ফ্রেন্ডলিস্ট তৈরি করা যেত; এই মাধ্যমই পরবর্তীকালে ফ্রেন্ডস্টার, মাইস্পেস এবং ফেসবুকের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। ইউরোপের অন্যতম টেলিকম সংস্থা টেলিফোনিকা ইন্টারনেটের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৫ সালে তাদের ইনফোভিয়া সেবার মাধ্যমে মানুষ প্রথম ডায়াল-আপ সংযোগের সুযোগ পায়। এরপর ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে ইউরোপে প্রথম এডিএসএল চালু করে প্রতিষ্ঠানটি, যার ফলে টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করেই স্থায়ীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আসে এবং ব্রাউজিংয়ের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগলের উত্থান ঘটে ২০০৮ সালের দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ২০২৪ সালে গুগলের বাজার শেয়ার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১.৬২ শতাংশে, অথচ দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিংয়ের শেয়ার মাত্র ৩.৩৭ শতাংশ। ব্রাউজার যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম দিকে জনপ্রিয় ছিল মোজাইক ও নেটস্কেপ নেভিগেটর। বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ৯৫ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ে বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করলেও প্রযুক্তির পরিবর্তনে এখন তার শেয়ার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমানে গুগলের ক্রোম ব্রাউজার ৬৪.৭ শতাংশ শেয়ার নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে; অ্যাপলের সাফারি ১৮.৫৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে দ্বিতীয় এবং মাইক্রোসফট এজের শেয়ার প্রায় ৪.৯৮ শতাংশ। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রায় মানুষের যোগাযোগের অভ্যাসও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। টেলিফোনিকার মতে, প্রথম ওয়েবসাইট চালুর সময় বার্নার্স-লি সম্ভবত বুঝতে পারেননি যে তাঁর এই আবিষ্কার মানবজাতির জন্য কত বড় বিপ্লব বয়ে আনবে। গবেষক জনি ওয়ালফিজের মতে, ইন্টারনেট ও অ্যাস্ট্রোনট শব্দের সংমিশ্রণে ইন্টারনেট শব্দটি তৈরি হয়েছে। সার্নের সেই ছোট্ট পদক্ষেপ আজ মানবসভ্যতার তথ্য বিনিময়ের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে, এবং সেই সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর এই দিনটি পালিত হয়। সূত্র: ইউরো নিউজ