মহাজাগতিক গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করল নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টিইএসএস)। সম্প্রতি এই মহাকাশযানটি প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় মাইক্রোলেনসিং প্রক্রিয়ায় একটি দানবীয় গ্রহ আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহটি 'গায়া২৩ব্রা বি' নামে পরিচিতি পেয়েছে। এটি একটি কমলা রঙের বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যার ভর আমাদের সূর্যের তুলনায় শতকরা ৮০ ভাগ। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই গ্রহের আকার ও প্রকৃতি অনেকটাই বৃহস্পতি গ্রহের মতো। এর ভর বৃহস্পতি অপেক্ষা ১.৬ গুণ বেশি এবং কক্ষপথের দূরত্বও প্রায় একই রকম।
টিইএসএস-এর স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি হলো নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করা গ্রহগুলোকে শনাক্ত করা। কিন্তু নতুন এই আবিষ্কার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। গ্রহটি নিজের নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে, যা টিইএসএস-এর প্রচলিত সক্ষমতার বাইরে একটি ঘটনা। নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডায়ানা ড্রাগোমির এই আবিষ্কার সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, মহাকাশে টিইএসএস উৎক্ষেপণের সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এটি একদিন এ ধরনের একটি গ্রহ খুঁজে পাবে। তিনি আরো বলেন, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে টিইএসএস-এর সংরক্ষিত আর্কাইভ ডেটার মধ্যে হয়তো আরো অসংখ্য মাইক্রোলেনসিং গ্রহ লুকিয়ে আছে, যা গবেষকেরা আগে খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।
ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। ২০২৩ সালে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির গায়া স্পেস টেলিস্কোপ প্রথম এই গ্রহের অস্তিত্বের আভাস দেয়। তখন গায়ার অ্যালার্ট সিস্টেমে ধরা পড়ে যে একটি নক্ষত্র হঠাৎ করে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি মহাকর্ষীয় মাইক্রোলেনসিং নামক একটি প্রক্রিয়া। এটি তখন ঘটে যখন একটি নক্ষত্র অন্য একটি দূরবর্তী নক্ষত্রের সামন দিয়ে অতিক্রম করে এবং নিজের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কারণে পেছনের নক্ষত্রের আলোকে বিবর্ধিত করে। পরবর্তীকালে গবেষকেরা টিইএসএস-এর আর্কাইভে সেই একই সময়ের তথ্য পরীক্ষা করে দেখেন এবং আবিষ্কার করেন যে টিইএসএসও ওই একই মহাজাগতিক ঘটনা ধারণ করেছিল।
উল্লেখ্য, টিইএসএস সাধারণত পৃথিবীর খুব কাছাকাছি, মাত্র ১৫০ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত গ্রহ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ। কিন্তু 'গায়া২৩ব্রা বি' পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি ব্যতিক্রমী আবিষ্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এই ঘটনা টিইএসএস-এর পূর্বের অজানা এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো দূরবর্তী ও বিরল গ্রহ আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।
এই আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করল বলে মনে করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মাইক্রোলেনসিং কৌশলের মাধ্যমে এই প্রথম টিইএসএস-এর মতো একটি সার্ভে টেলিস্কোপ গ্রহ শনাক্ত করল, যা ভবিষ্যতে আরো বহু অজানা মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান দিতে পারে।




