মার্কিন প্রশাসনের নতুন এক প্রতিবেদনে চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশকে ‘ছায়া ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্কের’ সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগ, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনে তৈরি পণ্য উৎস দেশ গোপন করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের অফিস অব ট্রেড অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং পলিসি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৪০টি ভিন্ন অঞ্চলের নেটওয়ার্ক দিয়ে চীনা পণ্য পুনঃরুট করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ডলার।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র জানান, চীনা উদ্যোক্তাদের দমনে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি প্রয়োগের এই প্রয়াসের তারা ‘কঠোর বিরোধিতা’ করে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ করা অন্য সরকারগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সিঙ্গাপুরও পাল্টা অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র আরিয়ানা পোডেস্তা বলেছেন, শুল্ক ও অশুল্ক উভয় বিষয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখলেও ইইউর নিয়মকানুন ও নিয়ন্ত্রক স্বায়ত্তশাসন ‘আলোচনার বিষয় নয়’।

গত ১৫ আগস্ট সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (এমটিআই) পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা ‘বাণিজ্য বিধি মেনে চলাকে গুরুত্ব সহকারে নেয়’। দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের প্রশ্নের জবাবে এমটিআই জোর দিয়ে বলে, আন্তর্জাতিক বিশ্বস্ত ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের সুনাম বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সিঙ্গাপুর। তারা আরও জানায়, ‘ব্যবসায়ীরা সিঙ্গাপুরের সাথে নিজেদের সংশ্লিষ্টতা ব্যবহার করে প্রতারণামূলক ও অসাধু উপায়ে অন্য দেশের আইন-কানুন লঙ্ঘন বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তা তারা সমর্থন করে না।’

ট্রান্সশিপমেন্ট কী? ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মতে, কোনো পণ্য দেশ এ থেকে দেশ সি-তে যাওয়ার পথে দেশ বি-তে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করলে তাকে ট্রান্সশিপমেন্ট বলে। এতে পণ্যটির উৎপত্তির দেশ বদলে যায়, যা চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণত মধ্যবর্তী স্টপে যদি পণ্যের মূল্য তেমন একটা বাড়ানো না হয়, অর্থাৎ শুধু নতুন লেবেল লাগানো হয়, তাহলেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়।

হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে অভিযোগ, এই অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের মধ্যে ‘রিলেবেলিং, রিপ্যাকেজিং, নতুন চালান, সামান্য প্রক্রিয়াকরণ, ভুল উৎস দেশ ঘোষণা বা এমন অন্যান্য কার্যকলাপ’ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যার মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক উৎস ঘোষণা করলে যে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যেত না, তা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তবে ২০১৮ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন চীনা আমদানির উপর শুল্ক আরোপের পর থেকে অনেক কোম্পানি এখন ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর মতো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তাদের সরবরাহ চেইন পরিচালনা করছে। চীনা উপকরণে তৈরি পণ্যের চূড়ান্ত সমাবেশের জন্য তারা এসব দেশ ব্যবহার করছে। যেহেতু এই কার্যক্রমে কিছু মূল্য সংযোজন হয়, তাই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত পণ্যটিকে চীনের নয়, বরং সেই তৃতীয় দেশের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

হোয়াইট হাউস কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের মতে, সম্ভাব্য অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের পরিমাণ বর্তমানে ৩৪.২ বিলিয়ন থেকে ৮৯.৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। হোয়াইট হাউসের দাবি, এই ‘অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের’ কারণে ৪৫০ হাজার কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বার্ষিক জিডিপি ১১৩ বিলিয়ন থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলার কমেছে এবং ফেডারেল রাজস্ব ক্ষতি ১৯ বিলিয়ন থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

প্রতিবেদনে চীনের ‘ছায়া ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্কে’ জড়িত ৪০টি অর্থনীতির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে টিয়ার ১-এ থাকা আটটি অঞ্চলকে ‘বৈচিত্র্যময় স্কেল লিডার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে চীনের সাথে যুক্ত পণ্যের বড় পরিমাণ বৈধ বাণিজ্যের মধ্যেই অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের ঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ইজরায়েল ও ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকটি মিত্র এ তালিকায় রয়েছে। মেক্সিকো ও ভারতও এই তিয়ারে উল্লেখ করা হয়েছে। টিয়ার ২-এ থাকা ছয়টি অর্থনীতিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘স্কেল লিডার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যাদের চীনের সাথে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বাকি ৪০টি দেশের বেশিরভাগই টিয়ার ৩-এ রয়েছে, যাদের যুক্তরাষ্ট্র ‘ছোট, সুবিধাবাদী চীনা লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই তিয়ারে সিঙ্গাপুর, মিয়ানমার ও ফিলিপাইনের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানের মতো মধ্য এশীয় দেশ এবং আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো দক্ষিণ আমেরিকার দেশ রয়েছে।

দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা থাকলেও প্রতিবেদনে চীন ও বাকি ৪০টি অর্থনীতির বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। তবে অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্ট শনাক্ত করতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ডেটা বিশ্লেষণ করবে এমন একটি ‘এআই-সক্ষম ডিটেকটিভ বর্ডার’ তৈরির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো নিয়ন্ত্রক বা প্রয়োগমূলক পদক্ষেপ না নিলেও তালিকায় নাম আসাটাই এক ধরনের চাপ। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ফিনটেক কোম্পানি এসডিএক্সের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সং সেং উনের মতে, ‘সিঙ্গাপুরের নাম উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের বৃহত্তম গেটওয়ের উপর সম্মতিমূলক চাপ তৈরি করছে এবং শুধু উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বড় ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলোর উপরও নজরদারি বাড়ানোর সংকেত দিচ্ছে।’