রাশিয়ার ভূখণ্ডে বিশাল আকারের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রোববার রাতে সংঘটিত এই হামলায় রাশিয়ায় অন্তত সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন। রুশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা। আঞ্চলিক গভর্নরের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মোট ৮২২টি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬০০টির লক্ষ্যবস্তু ছিল মস্কো। রাজধানীর ওপর সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে ভয়াবহ ড্রোন হামলাগুলোর একটি হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেছেন তিনি।
হামলায় রুশ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মস্কোর কেন্দ্র থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কোলেদিনো অঞ্চলে অবস্থিত এই গুদামে হামলার ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে গুদামটিতে আগুন জ্বলতে এবং কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে। রাশিয়ার 'অ্যামাজন' হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি গত জুলাই মাস থেকেই একাধিকবার হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। কিয়েভ পূর্বে জানিয়েছিল, রুশ সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যাহত করার লক্ষ্যে তারা সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যবহৃত পণ্য সরবরাহ ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করছে।
রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলে রাতের হামলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে গভর্নর নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী বাসে হামলায় এক নারী নিহত হয়েছেন। মস্কোর গভর্নর আন্দ্রে ভোরোবিয়ভের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ড্রোন হামলায় ৮৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, এই হামলার ফলে ওয়াইল্ডবেরিজের ১০টি প্রধান পণ্য পরিবহন ও সরবরাহকেন্দ্রের মধ্যে সাতটিই অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনেও রাশিয়ার হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ৩৯ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সম্প্রতি ইউক্রেনজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে রাশিয়া। এর জবাবে কিয়েভও রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি আবাসিক ভবনে রাশিয়ার বোমা হামলায় ৬৬ ও ৬৪ বছর বয়সী এক দম্পতি নিহত হয়েছেন। দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের ক্রিভি রিহ শহরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সুমি, দোনেৎস্ক ও খেরসন অঞ্চলেও প্রতিটিতে একজন করে প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। সুমি অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
রুশ হামলার সময় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর চারবার সাইরেন বেজে উঠেছিল। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, এতে এক শিশুসহ কমপক্ষে ছয়জন আহত হয়েছেন। রাশিয়া দাবি করেছে, শনিবার রাতে তারা ইউক্রেনের 'ফ্ল্যামিঙ্গো' ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা এবং ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরির আরেকটি কারখানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
কিয়েভের পোচাইনা এলাকার একটি বইয়ের বাজার রাশিয়ার হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারের মাটিতে পুড়ে যাওয়া বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ৬৯ বছর বয়সী ভ্যালেন্তিনা জানান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা বইগুলো তার স্বামীর স্টলের। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা এই বইগুলো দেখেই তিনি তাদের স্টল চিনে ফেলেছেন। তিনি আরও বলেন, এমন বিপদ যে কারও জীবনে ঘটতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের ১৩টি অঞ্চলে রাশিয়া হামলা চালিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাশিয়া তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে থাকা যেকোনো বেসামরিক অবকাঠামোতেই আঘাত হানছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা বর্তমানে রুশ দখলে রয়েছে।




