গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ অরাজকতা সৃষ্টি করলে, সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। কেউ সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়, কেউবা গণভবন ও সংসদ ভবন পরিষ্কারের কাজে অংশগ্রহণ করে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে এলাকায় এলাকায় পাহারা দেয় অনেকে, আর নগরীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে কেউ কেউ শুরু করে দেয়ালচিত্র আঁকার কাজ।

সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী আসহাবিল ইয়ামিন তার গ্রন্থনায় জানিয়েছেন, এই প্রজন্ম নিয়ে অনেকেরই নানা অভিযোগ থাকলেও আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেয়ালগুলোতে লেখা স্লোগান ও পোস্টারের ছড়াছড়ি তাদের নতুন কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করে। দেয়ালচিত্র আঁকার ধারণা আসে সেই নোংরা ও অগোছালো জায়গাগুলোকে রঙিন করে তোলার জন্য।

তিনি বলেন, 'আমি সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী। যখন দেখলাম চারপাশে এ ধরনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে, আমরাও উদ্যোগ নিলাম কিছু করার।' দেয়ালচিত্রের জন্য বেছে নেওয়া হয় কলেজের সামনের অংশ থেকে শুরু করে হলি ক্রস কলেজ পর্যন্ত এলাকা। প্রথমে সিনিয়র ও জুনিয়রদের নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। শিক্ষকদের মধ্যে মঈন স্যার অর্থ সংগ্রহসহ সব কাজে সহায়তা করেন।

দেয়ালগুলো প্রথমে পোস্টারে ভর্তি ছিল। শিক্ষার্থীরা সেগুলো পরিষ্কার করে, যাতে রং ভালোভাবে বসে। বিষয় নির্বাচন নিয়েও সবার সঙ্গে আলোচনা হয়। অনেকেই দেয়ালচিত্র আঁকায় নবীন ছিলেন, তাই শুরুতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। তবে সিনিয়ররা পরামর্শ দেন—কোন দেয়ালে কী রং ব্যবহার করতে হবে, কোন ব্রাশ ব্যবহার করলে ভালো হয়—প্রতিটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা পান তারা।

প্রথম দিকে কয়েকজন কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে আশপাশের স্কুল-কলেজের ছোট ছোট শিক্ষার্থীও যুক্ত হয়। অনেকে মা-বাবাকে নিয়ে আসেন আঁকাআঁকিতে অংশ নিতে। সবার সহযোগিতায় প্রায় আড়াই দিনের মধ্যে বাইরের দেয়ালের কাজ শেষ হয়। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কলেজের ভেতরের কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে, যা শিগগিরই শেষ হবে বলে জানিয়েছেন আসহাবিল ইয়ামিন।

তিনি আরও বলেন, হাইস্কুল থেকেই তিনি আঁকাআঁকির সঙ্গে যুক্ত। পুরস্কার ও সার্টিফিকেট অনেক পেলেও দেয়ালচিত্র আঁকার পর সবার কাছ থেকে যে প্রশংসা পেয়েছেন, তা তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। নিজের আঁকা ছবির মাধ্যমে তিনি জানাতে চান, 'দেশটা হোক নিরাপদ ও সুন্দর, যেখানে সবাই জাতপাত ভুলে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে। কখনো কারও ব্যক্তিস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে না।'

এই উদ্যোগ শুধু দেয়াল রাঙানো নয়, বরং দেশ পুনর্গঠনের এক প্রতীকী প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সংকটের মুহূর্তে তারাই সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।