ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন ও নির্বিঘ্ন গণপরিবহন নিশ্চিত করতে একটি বিশাল দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) উপস্থাপন করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ ভবনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এসটিপি ২০২৬–২০৪৫ অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে ঢাকায় মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বর্তমান ১৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আটটি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, দুটি বিআরটি লাইন, তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি পরিবহন হাব। ধাপে ধাপে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে: ২০৩০ সালের মধ্যে ৭২ দশমিক ২ কিলোমিটার, ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে উন্নীত হবে। পাশাপাশি মেট্রোরেলের ফিডার সার্ভিস হিসেবে প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাঁচটি মনোরেল করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ডিটিসিএ জানিয়েছে।

সভায় নগরীতে গণপরিবহনের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। ডিটিসিএর তথ্যমতে, ২০১৪ সালে দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মোটরসাইকেল, তিন চাকার যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই নেতিবাচক প্রবণতা পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।

রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশে তিনটি রিং রোড নির্মাণের কাজ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি বৃত্তাকার নৌপথ ও একাধিক ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো পর্যায়ক্রমে নগরের বাইরে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বাস রুট র্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার অগ্রগতি নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। ডিটিসিএর হিসাব অনুযায়ী, বিআরটিএ অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৯৮টি। এ অবস্থায় ৩২টি প্রধান রুট এবং ২৫টি ফিডার রুট নিয়ে নতুন বাস নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘র্যাপিড পাস’ কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে ডিটিসিএ জানিয়েছে, বর্তমানে ১৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী এই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছেন। শুধু মেট্রোরেলেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ লাখ ট্রিপ এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্টের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। গাবতলী, কমলাপুর ও বিমানবন্দর এলাকায় মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়, যেখানে মেট্রোরেল, বাস, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে সমন্বিত করে যাত্রীদের জন্য নির্বিঘ্ন যাতায়াতের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান। উল্লেখ্য, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলের পরিবহন পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ডিটিসিএ। ১১টি মন্ত্রণালয় ও ২৭টির বেশি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকির কাজ করে থাকে সংস্থাটি।