তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্বঘোষিত 'ভাববাদী' বালাজি শ্রীনিবাসনের বিশ্বব্যাপী এক যাযাবর শিক্ষা সম্প্রদায় গড়ার স্বপ্ন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর দ্রুতই মধ্য এশিয়ায় নতুন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। কয়েনবেজের সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মালয়েশিয়ার জোহর প্রদেশে অবস্থিত ফরেস্ট সিটি প্রকল্পে তার নেটওয়ার্ড স্কুল পরিচালনা করে আসছিলেন, যা সিঙ্গাপুরের সীমান্তের অপর পাড়ে একটি কৃত্রিম দ্বীপে অবস্থিত। একটি অনির্দিষ্ট লোকেশন সংবলিত সামাজিক মাধ্যম ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনলাইনে তদন্তকারীরা এটির অবস্থান চিহ্নিত করে, যা তদন্তের মুখে ২১ জুলাই স্কুলটির ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিলের কারণ হয়। পরের দিনই, ২২ জুলাই, শ্রীনিবাসান এক এক্স বার্তায় জানান যে তিনি কাজাখস্তানের কতৃপক্ষের সঙ্গে এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি লিখেন, 'আমাদের নতুন ক্যাম্পাস বিশ্ব প্রযুক্তিগত আশাবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যেখানে দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া, সহজ পুনরাবাসন ও দক্ষ জনশক্তির নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।'

মালয়েশিয়া ত্যাগের ঘটনাটি একটি কয়েক সপ্তাহব্যাপী নাটকীয়তার সর্বশেষ অধ্যায়, যেখানে জড়িত রয়েছে ক্রিপ্টো-বান্ধব প্রযুক্তি স্বপ্নাদর্শন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ এবং চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট। মালয়েশিয়ার আইনে ইসরায়েলি পাসপোর্টধারীদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, অনলাইনে অভিযোগ ওঠে ইসরায়েলি নাগরিকরা অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে নেটওয়ার্ড স্কুলের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের তদন্তে ভ্রমন নথিপত্র সংক্রান্ত কোনো জালিয়াতি প্রমাণিত হয়নি, তবে ইস্কান্দার পুতেরি সিটি কাউন্সিল লাইসেন্সের শর্ত ও প্রাঙ্গণ ব্যবহারের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ২১ জুলাই লাইসেন্স বাতিল করে। জোহরের মুখ্যমন্ত্রী ওন হাফিজ গাজি সামাজিক মাধ্যমে জানায় যে, প্রদেশ সরকার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে এবং ২২ জুলাই থেকে সকল কার্যক্রম বন্ধের আদেশ কার্যকর।

বিতর্ক এখন কূটনৈতিক স্তরে গড়িয়েছে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নামাকে জানান, দ্বৈত নাগরিক এক ইসরায়েলি-মার্কিন ব্যক্তিকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের পরারাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েল নীতি ব্যাখ্যার জন্য মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। নেটওয়ার্ড স্কুল ২০২৪ সালে ১০০ জন বৈশিক অংশগ্রহণকারী নিয়ে ৯০ দিনের পাইলট প্রকল্প হিসাবে শুরু হয়, যা ২০২৫ সালের শুরুতে এক বছর মেয়াদী কর্মসূচিতে রূপ নেয়। মাসিক ১,৫০০ ডলার ব্যসার বিনিময়ে এই কো-লিভিং স্পেসটিতে আবাসন, খাদ্য, জিম সুবিধা এবং নিয়মিত প্রযুক্তি ওয়ার্কশপ ও হ্যাকাথন আয়োজন করা হয়। সিলিকন ভ্যালি বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে এটি অনেক সাশ্রয়ী ছিল। শ্রীনিবাসনের আগে যুক্তরাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে জাতি সার্বভৌমত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার ধারণা প্রচার করে পরিচিত ছিলেন এবং ২০২২ সালে 'নেটওয়ার্ড স্টেট' নামে একটি বই প্রকাশ করেন।

ফরেস্ট স্টি নামটি চীনা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কান্ট্রি গার্ডেনের ২০১৬ সালে শুরু করা এক বিশাল আবাসিক প্রকল্প। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে সমর্থিত এই নগরীর লক্ষ্য ছিল ৭ লক্ষ লোকের আবাসন, কিন্তু প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কমিটমেন্ট থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের মাত্র ১৫% নির্মিত হয়েছে। চীনা নাগরিকদের জন্য বানানো অ্যাপার্টমেন্টগুলোর চাহিদা চীনের পুঁজি নিয়ন্ত্রণ, কোভিড মহামারী ও এভারগ্র্যান্ডের ধ্বসের পর ধসে পড়ে। কাজাখস্তানের উদ্দেশ্যে যাত্রা প্রসঙ্গে জানা গেছে, নেটওয়ার্ড স্কুল ও দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদী চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় যৌথ আন্তর্জাতিক ইভেন্ট, হ্যাকাথন এবং সম্ভাব্য নেটওয়ার্ড স্টেট সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট টোকায়েভ সম্প্রতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে তাদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করে বিনিয়োগের আবহান জানিয়েছিলেন।