যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শুল্ক আরোপের কৌশল গ্রহণ করলেও, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ে তা বড় ধাক্কা খায়। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে বর্তমান প্রশাসন নতুন একটি পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আদালতে টিকে থাকার মতো পুরনো আইন, বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন, ব্যবহার করে একটি স্থিতিশীল শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন তাদের মূল কৌশল।

সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে, জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ার অজুহাতে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছে হোয়াইট হাউস। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটিই চূড়ান্ত নয়, বরং শুল্ক আরোপের এক বিস্তৃত ধারাবাহিকতার সূচনা মাত্র। আগামী মাসগুলোতে বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদ আরও জোরদার করতে অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন এবং সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্সের মতো কৌশলী খাতকে জাতীয় নিরাপত্তার ছত্রছায়ায় নিয়ে আসতে একাধিক তদন্ত ও পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে।

কানাডীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সেনোভাস এনার্জির সহযোগী প্রধান আইন উপদেষ্টা ড্যান উজকজো-এর মন্তব্য অনুসারে, ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির প্রারম্ভিক অধ্যায় এখন সমাপ্তির পথে। তিনি বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, বলা যায়, সর্বোচ্চ গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ তাঁর বাণিজ্য নীতির বড় অংশ পুরোপুরি কার্যকর হবে।” এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চূড়ান্ত শুল্ক কাঠামো নিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র পাবে, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য এটি হবে নতুন দুশ্চিন্তার কারণ। ৩৪০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যমানের বিশাল মার্কিন আমদানি বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশ আরও বাণিজ্যিক ছাড় দিতে বাধ্য হবে।

পূর্বের শুল্ক ব্যবস্থায় যেসব দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ হারে কর আরোপিত ছিল, শুক্রবার তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে ১৯৭৪ সালের আইনের ৩০১ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, এই নবতম নিয়মটি দেশটির সার্বিক আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ ভাগকে প্রভাবিত করবে। ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘লিবারেশন ডে’ নীতির বৃহদাংশ এর মাধ্যমে পুনর্গঠিত হচ্ছে। ওই নীতি অনুসারে সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রের পণ্যেই ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসানো হয়েছিল, তবে জাতীয় জরুরি আইনের অপপ্রয়োগের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে অবৈধ সাব্যস্ত করে।

একইসাথে, অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা খতিয়ে দেখতে ৩০১ ধারায় আরেকটি তদন্তের আওতায় চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ১৬টি মূল বাণিজ্য ভাগীদারকে রাখা হয়েছে। ভর্তুকি ও রপ্তানিনির্ভর নীতি এই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।

যদিও নতুন শুল্ক ঘোষণা নিয়ে চর্চা তুঙ্গে, অনেক ব্যবসায়ী এটিকে খুব বড় একটি অস্থিরতা হিসেবে দেখছেন না। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার প্রস্তুতকারক বিসেল ইনকর্পোরেটেডের প্রধান নির্বাহী মার্ক বিসেল ই-মেইল বার্তায় জানান, শুল্কের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলেই তারা শুরুতেই ধারণা করেছিলেন। সেই হিসাব অনুযায়ী ব্যবসার পরিকল্পনাও সাজানো হয়েছিল, তাই শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে পণ্য মজুত বাড়ানোর প্রয়োজন পড়েনি।

তবে রাজস্বের দিক থেকে ট্রাম্পের দ্রুত আরোপিত শুল্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক থেকে প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসে, যদিও পরবর্তীতে আদালতের রায়ে আমদানিকারকদের সেই অর্থ ফেরত দিতে হওয়ায় হিসাব এখন ঋণাত্মক। লেনদেন ভারসাম্যের সংকট মোকাবিলার অস্থায়ী শুল্ক থেকে ৩১ বিলিয়ন ডলার জুলাই পর্যন্ত আদায় হলেও, এটিও ফেরতের সম্ভাবনায় রয়েছে। ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করতে চলা জাতীয় ঋণ সামলাতে এই শুল্ক রাজস্বের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কির ভাষ্য, “ইটের পর ইট গেঁথে আবার শুল্কপ্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে, এবং সেটা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো করেই।”

আইনি চ্যালেঞ্জ জারি আছে। জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে ৩০১ ধারার এই বিস্তৃত ব্যবহারের বিরুদ্ধে কিছু ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে মামলা করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব মামলার নিষ্পত্তি হতে যথেষ্ট সময় লাগবে, কারণ উক্ত ধারাটি আইনি লড়াইয়ে ঐতিহাসিকভাবে টিকে আসছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, উৎপাদন স্বদেশে ফিরিয়ে আনা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে সব রকমের আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।

তবে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। ট্রাম্পের আকস্মিক শুল্ক ঘোষণার ধারা অব্যাহত আছে। কানাডার ক্ষেত্রে সম্প্রতি বিয়ার ও দুগ্ধজাত পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়েছেন, পাশাপাশি স্পেনের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য স্থগিতের সতর্কতাও দিয়েছেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঈশ্বর প্রসাদের মতানুসারে, শুল্ককে রাজনৈতিক অসন্তোষের জবাব হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, যার নেতিবাচক প্রভাব শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং আমেরিকার নাগরিক ও ব্যবসার ওপরও পড়বে।