ফসলে পোকা দেখা দিলেই সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বারাকান্দী গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম ছুটে যান স্থানীয় কীটনাশকের দোকানে। কীটনাশক নির্বাচন, প্রয়োগের মাত্রা বা কতবার ছিটাতে হবে — সব বিষয়ে তিনি দোকানদারের পরামর্শই মেনে চলেন। প্রয়োগের দুই-এক দিনের মধ্যেই অনেক সময় তিনি শাকসবজি তুলে বাজারে নিয়ে যান। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ বা মাঠপর্যায়ে তদারকি না পাওয়ায় দ্রুত সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে তাঁকে এই দোকানেই আসতে হয় বলে জানান শহিদুল।

তাঁকে পরামর্শ দেওয়া বিক্রেতা মোহাম্মদ সোনাউল্লার নিজের কোনো লাইসেন্স নেই। অন্য একজনের লাইসেন্স ব্যবহার করে তিনি ব্যবসা চালান। কীটনাশক ব্যবহার বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও তাঁর নেই। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি কৃষকদের ওষুধ বেছে দেন এবং ব্যবহারবিধি বোঝান। তবে নিরাপদ মাত্রা, ফসল তোলার আগে কত দিন অপেক্ষা করতে হয় — এই উইথহোল্ডিং পিরিয়ড কিংবা দেশে কোন কোন কীটনাশক নিষিদ্ধ, এসব বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই বলে স্বীকার করেন তিনি।

শহিদুল ও সোনাউল্লার এই সম্পর্ক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের অনেক এলাকাতেই কৃষকের প্রধান ভরসা এখনো খুচরা বিক্রেতা। সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার সীমিত উপস্থিতি, দুর্বল তদারকি এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে এই অনানুষ্ঠানিক পরামর্শব্যবস্থাই হয়ে উঠেছে কৃষকের নির্ভরতার জায়গা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের গবেষকেরা টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের ৬০০ কৃষকের ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য পেয়েছেন। ২০২৫ সালের চাষ মৌসুমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কৃষকদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর কীটনাশকের প্রভাব মূল্যায়ন করাই ছিল গবেষণাটির লক্ষ্য। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, কীটনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা নিতে ৬৫ শতাংশের বেশি কৃষক খুচরা বিক্রেতা বা ডিলারের ওপর নির্ভর করেন। মাত্র ১৯ শতাংশ কৃষক কীটনাশকের গায়ে লেখা নির্দেশনা অনুসরণ করেন। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন প্রায় ১২ শতাংশ কৃষক। অর্থাৎ, যাঁদের অনেকের কৃষিবিষয়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, সেই ব্যক্তিদের ওপরই নির্ভর করছেন কৃষকের বড় একটি অংশ।

নিরাপদ মাত্রা মেনে কীটনাশক প্রস্তুত করেন মাত্র এক-চতুর্থাংশ কৃষক। বাকি প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সুপারিশের চেয়ে বেশি ঘনত্বে কীটনাশক ব্যবহার করেন। সিরাজগঞ্জে এই হার প্রায় ৬৯ শতাংশ। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টাঙ্গাইলে ১২ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জে ২০ শতাংশ কৃষক বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এমন কীটনাশক ব্যবহার করছেন। সিরাজগঞ্জের প্রায় ৩ শতাংশ কৃষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তালিকাভুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক শ্রেণির কীটনাশকও ব্যবহার করছেন।

মাঠপর্যায়ে কীটনাশক বিক্রির লাইসেন্স দেওয়া ও তদারকির দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। সংস্থাটির উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৯০০ ব্র্যান্ডের ৩২৭ ধরনের কীটনাশক নিবন্ধিত। খুচরা ডিলারের সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার, আর পাইকারি ডিলার প্রায় ৫ হাজার ৭০০। উপজেলা পর্যায়ে তিনজন এবং জেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা পেস্টিসাইড ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে একজন কর্মকর্তাকে গড়ে প্রায় ৪৪ জন খুচরা ডিলার তদারকি করতে হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত কৃষক প্রশিক্ষণে কীটনাশক প্রয়োগের সতর্কতা সম্পর্কে জানানো হয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার দায়িত্বও কৃষকের। তবে প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে নিয়মিত গিয়ে খোঁজ নেওয়ার মতো জনবল মাঠপর্যায়ে নেই। অনুমোদন ছাড়া কীটনাশক বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে, কিন্তু প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া অধিদপ্তরের একার পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

কীটনাশক প্রয়োগের পর ফসল তোলার আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়, যাকে ‘উইথহোল্ডিং পিরিয়ড’ বলা হয়। এই নিয়ম সম্পর্কে জানেন মাত্র ৪১ শতাংশ কৃষক। তাঁদের মধ্যেও প্রায় ৩৯ শতাংশ মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা মানা বাধ্যতামূলক নয়। আর প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষকের ধারণা, নির্ধারিত সময়ের আগে ফসল তুললেও তেমন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। উদ্বেগের বিষয় হলো, যাঁরা এই সময় সম্পর্কে জানেন বলে দাবি করেন, তাঁদের মধ্যেই অনিরাপদ চর্চা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকার একমাত্র কারণ অপেক্ষাকাল না মানা নয়। দেশে ব্যবহৃত কীটনাশকের বড় অংশই নিম্নমানের ও অপরিশোধিত। এসব কীটনাশকে ভারী ধাতুসহ তেজস্ক্রিয় উপাদান মিশে থাকার আশঙ্কা প্রবল। আমদানি পর্যায়ে কীটনাশকের গুণগত মান পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান না থাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। অনেকের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও একাধিক কীটনাশক একসঙ্গে মেশানোর প্রবণতাও দেখা যায়, যা খাদ্যশৃঙ্খলে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সরাসরি কীটনাশক প্রয়োগকারী কৃষকেরাও এর প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সিরাজগঞ্জে জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি কৃষক কীটনাশক ব্যবহারের পর ত্বকে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অথচ কীটনাশক ছিটানোর সময় নিয়মিত গ্লাভস, মাস্ক বা অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন মাত্র ১৯ শতাংশ কৃষক। প্রায় ৬৩ শতাংশ কৃষক স্প্রে করার সময় বাতাসের দিকও বিবেচনা করেন না।

সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালের (সিএবিআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার হয় এবং প্রতি বছরই এর ব্যবহার বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় প্রতিটি কৃষিপণ্যেই এখন মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্যাস্ট্রিক, লিভারের সমস্যা, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, চর্মরোগসহ একাধিক রোগের সঙ্গে কীটনাশকের সংশ্লিষ্টতা আছে।

টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের জন্য সম্প্রতি ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কমিটির সদস্য সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন বলেন, কীটনাশক নিজেই এক ধরনের বিষ, তবে জাতীয় বিধিমালা অনুযায়ী তা হতে হবে বিশুদ্ধ। নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানি করা কীটনাশকের মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।