দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। রোববার দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে কারখানা স্থাপন করতে হলে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে দেশে শান্তি বজায় রাখা অপরিহার্য। বিশৃঙ্খল পরিবেশে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। কারখানার উৎপাদিত পণ্য বন্দরে পৌঁছানো এবং কাঁচামাল সংগ্রহেও যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মিল-কারখানা সচল না থাকলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে স্কুল-কলেজের পরিবেশ উন্নত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন বই বিতরণের মতো কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাদের যেন কোনো সুযোগ না দেওয়া হয়। বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপের ফলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ বিভ্রান্তকারীরা নিজেদের স্বার্থে কাজ করে, জনগণের পাশে থাকে না।

বাংলাদেশের জনগণের সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নেওয়া নাকি ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া — জনগণকেই এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। বিভ্রান্তিকর শক্তির সঙ্গে না গিয়ে উন্নয়নের পথে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। নির্বাচনের পর এক মাসের মধ্যে এই কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল এবং তা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মায়েরা সংসারের দায়িত্ব নিতে পারবেন, সন্তানদের লেখাপড়া ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ডের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সমুদ্র সম্পদ কাজে লাগানোর প্রচেষ্টার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এ লক্ষ্যেই তিনি মাতারবাড়ি পরিদর্শন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাঁশখালীতে ১০০টি অসচ্ছল পরিবারের মাঝে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ এবং একটি সংযুক্ত শৌচাগার রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বিবেচনা করে এসব ঘর নির্মাণে আরসিসি পিলার, কাঠ ও টিন ব্যবহার করা হয়েছে। চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিশুকে আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও ২০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি আজ সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি পৌঁছায়। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেলিকপ্টার থেকে নামেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এর আগে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে রওনা হয়ে প্রধানমন্ত্রী তেজগাঁও বিমানবন্দরে যান এবং সোয়া ৯টায় হেলিকপ্টার যোগে মাতারবাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী কর্মসূচিতে আরও ছিল — বেলা ২টায় ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, বিকেল সোয়া ৩টায় হাটহাজারীর আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত, বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে হাটহাজারী ডাকবাংলোয় যাত্রাবিরতি, বিকেল ৫টায় হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগদান এবং সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রামের ‘রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউ’ হোটেলে সাংগঠনিক সভায় অংশগ্রহণ। সব কর্মসূচি শেষে আজ রাত সাড়ে ৯টায় হজরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে ঢাকায় ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী।