ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) ব্যাপক বিনিয়োগের টানাপোড়েনের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি চলতি বছর ৩ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বুধবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে আইএমএফ ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এপ্রিলের ৩.১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করেছে। গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫ শতাংশ। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হয়ে ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে সংস্থাটি আশা করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যায়। ফলে জ্বালানি মূল্য আকাশচুম্বী হয়, যা ব্যবসা ও ভোক্তাদের চাপে ফেলে দেয়। আইএমএফের ধারণা, চলতি বছর তেলের দাম প্রায় ৩২ শতাংশ বাড়বে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাবে, যা ২০২৫ সালের ৪.১ শতাংশের চেয়ে বেশি। এর অর্থ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত দুই বছরের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে।

তবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিতে প্রচুর বিনিয়োগ যুদ্ধজনিত ক্ষতি আংশিকভাবে প্রশমিত করছে। আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক পেটিয়া কুইভা ব্রুকস বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, 'যুদ্ধের ধাক্কা যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, বিশ্ব অর্থনীতি তার চেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পেরেছে।'

আইএমএফের পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে যে হরমুজ প্রণালী এই মাসের শেষে পুনরায় চালু হবে এবং আগামী মার্চের মধ্যে এর মাধ্যমে বাণিজ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, আইএমএফ তার পূর্বাভাসে এই অনুমান করছে।

জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত হয়েছে, কারণ দেশগুলো বিদ্যমান তেল মজুদ ব্যবহার করতে পেরেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন বাড়িয়েছে। যেসব দেশ নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি করে এবং এআই বিনিয়োগ থেকে উপকৃত হয়, তারা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি এ বছর ২.৩ শতাংশ হবে বলে আইএমএফ আশা করছে, যা ২০২৫ সালের ২.১ শতাংশের চেয়ে বেশি এবং এপ্রিলের পূর্বাভাসের সমান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০২৫ সালের কর কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী শেয়ারবাজার মার্কিন অর্থনীতিতে গতি যোগ করছে। অন্যদিকে, ইউরো মুদ্রা ব্যবহারকারী ২১টি ইউরোপীয় দেশ, যা উচ্চ জ্বালানি মূল্যে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ১.৪ শতাংশ থেকে কমে এ বছর মাত্র ০.৯ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ৪.৬ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হবে, যা ২০২৫ সালের ৫ শতাংশের চেয়ে কম কিন্তু আইএমএফের এপ্রিলের পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা দ্রুত। উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও আবাসন খাতের পতনের কারণে চীনের অর্থনীতি ভারাক্রান্ত হলেও সরকারি অবকাঠামো ব্যয়, উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধি তা পুষিয়ে দিচ্ছে। ভারত আবারও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে স্থান পেয়েছে। শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয়ের কারণে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬.৪ শতাংশ হবে বলে ধরা হয়েছে, যা গত বছরের ৭.৭ শতাংশ থেকে কম।

আইএমএফ ১৯১টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি ঋণদানকারী সংস্থা, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে এবং বিশ্ব দারিদ্র্য কমাতে কাজ করে।