অতি ভারী বর্ষণের সপ্তাহ পেরোনোর পর অবশেষে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল থেকে পানি সরতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে সড়ক অবকাঠামো, ফসলি জমি ও জনপদের ব্যাপক ধ্বংসচিত্র। বন্যার পানি ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ, মাছের খামার ও গবাদি পশুর খামারে যে বড় ধরনের ক্ষতি রেখে গেছে, তা এখন স্পষ্ট হতে চলেছে। অনেক জায়গায় গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগের মূল চালিকাশক্তি আভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর সিংহভাগই এখন চলাচলের অনুপযোগী। কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট।

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলায় কৃষি, সড়ক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও অনেকগুণ বেশি। এখনো অনেক এলাকা জলমগ্ন থাকায় মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন শেষ হয়নি, ফলে চূড়ান্ত হিসাব আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী উপজেলা ও বান্দরবান জেলা। এসব অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে, বহু কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ফসল ও খামারের মাছ নষ্ট হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে বাড়িঘর ও ফসল হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

বান্দরবানে বন্যার তাণ্ডবে যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। শীলকখালের ব্রিজঘাটা বেইলি সেতুটি সম্পূর্ণ ভেসে গেছে এবং রাবার ড্যাম অকেজো হয়ে পড়েছে। ড্যামে আটকে পড়া পানির প্রচণ্ড চাপে শীলকখালের পানি প্রবাহের গতিপথ বদলে গেছে, সেই স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও বেইলি সেতুর একাংশ। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ ও জেবেল মুল্লুক জানান, খালের স্রোত লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি ছাড়েন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রবল স্রোত তাঁদের বাড়ি ভাসিয়ে বেইলি সেতুর ওপর ফেলে দেয়। শীলকখালের উত্তর পাড়ের বহু পরিবারের সহায়-সম্বল বিলীন হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ৬ জুলাই থেকে গত সোমবার পর্যন্ত জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ জনবসতি এলাকা প্লাবিত ছিল। এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ২ হাজার ৫৮২ জন মানুষ নিজ বাড়িতে ফেরার অপেক্ষায়। বন্যায় জেলার প্রায় সাড়ে ১২ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও ৪টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ২৬০ একর কৃষিজমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্যোগে লামা উপজেলায় ভূমিধসে পাঁচজন এবং পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর তাৎক্ষণিক সংস্কারে প্রায় ৭ কোটি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

রাঙামাটিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১০টি উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, আউশ ও আমন ধান, আদা, হলুদ এবং ফলের বাগানও রয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, মাঠে এখনো পানি থাকায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সওজ বিভাগের হিসাবে, জেলার ২৬টি স্থানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি, বান্দরবান-রাঙামাটি ও রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের পিচঢালাই ও রক্ষাদেয়াল ধসে পড়ায় সড়ক খাতে প্রাথমিক ক্ষতি প্রায় ৯ কোটি টাকা। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, পুকুর, মাছের ঘের ও পোনা নার্সারি ডুবে প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, ২৪টি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১০টি গরু ও ২ হাজার ৪০০ মুরগি মারা গেছে, এ খাতে ক্ষতি প্রায় ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।

খাগড়াছড়িতে মাইনি ও চেঙ্গী নদীর পানি নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে, তবে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। অনেক বসতঘর ও গৃহস্থালির আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজু আহমেদ জানান, বন্যায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মাছ ও মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার উল্লাহ বলেন, ৯টি উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুটি সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি সংস্কারকাজ চলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন জানান, জেলায় প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে উপজেলার ৩০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ হাজার ৬২০টি মৎস্য খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতে ৬টি ছাগল, ১ হাজার ৫০০ মুরগি ও ২০০ হাঁস মারা গেছে এবং পশুখাদ্য ও খামারের ক্ষতিসহ এ খাতে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সাতকানিয়ায় পানি দ্রুত নেমে গেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো প্রস্তুত হয়নি। কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে, আশা করা যাচ্ছে কালকের মধ্যে পুরোপুরি সরে গেলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।

বাঁশখালী উপজেলায় বন্যায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট এবং ২টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। পানি কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ফেরেনি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন ঘরবাড়ি পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত। উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে দুর্গতদের মধ্যে ১২৬ টন চাল, ১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং সাড়ে ৬ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে।