দেশে হামের প্রকোপ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গত সোমবার সকাল আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে হাম ও হামজনিত উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে একজনের দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে; বাকি ছয়জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে হয়েছে। মৃত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই ঢাকার বাসিন্দা এবং বাকি দুজন সিলেটের। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে ৯৯০ শিশু, যার মধ্যে ১২২ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। সংক্রমিতদের মধ্যে ৮৩১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯০০ জন।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ২৪৪ শিশু অসুস্থ হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩৫ জনের। এ পর্যন্ত মোট ৭৬৬ শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৯৫ শিশু। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৬ হাজার ২৭ শিশু, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯২ হাজার ৩৮৩ জন।
বাংলাদেশে হামের এই প্রাদুর্ভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রকট। গত আড়াই দশকে দেশে হামের সংক্রমণ কখনো ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে, সংখ্যাটি ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪। তারপর থেকে সংক্রমণ ক্রমশ কমছিল। ২০২৫ সালে নথিভুক্ত হয়েছিল মাত্র ১৩২ জন হাম রোগী। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। সেই সময়ে হামজনিত কোনো মৃত্যু ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ঘাটতিই এই ভয়াবহ সংকটের মূল কারণ। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তত পাঁচটি চিঠির মাধ্যমে টিকা সংকট সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। পাশাপাশি ১০টি সভায় সরকারি কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়। ইউনিসেফের মতে, টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার কারণে দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। বছরের শুরুতেই হামের সংক্রমণ শনাক্ত হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি।
বর্তমান সরকার জাতীয় এমআর টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও এখনো একটি বড় অংশ শিশু টিকার আওতায় আসেনি। এমআর টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই বয়সীদের ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশু। তার মানে, কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছে অন্তত ৪০ লাখ শিশু। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু এখনো হামের সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ব্যাপক টিকাদানের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নতুন সংক্রমণ ধরা পড়ছে এবং মৃত্যুর ধারা থামছে না।




