সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু করে তৈরি করা হয়নি—এমনটাই জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গত শনিবার তিনি স্পষ্ট করেন, এই চুক্তিতে ইরান কিংবা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
গত শুক্রবার ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তা তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাকান ফিদান বলেন, তাঁরা লিখিতভাবে কোনো অভিন্ন হুমকির কথা উল্লেখ করেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর বাইরে অন্য কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এ ছাড়া ফিদান জানান, এই চুক্তির প্রস্তুতি প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে চলছিল। অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার কারণে হঠাৎ এই চুক্তি তৈরি করা হয়নি—তার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।
ফিদান জানান, ‘কারিগরিভাবে’ এই চুক্তিটি ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর এই যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশে হামলা মানে সব সদস্যের ওপর হামলা। তবে নতুন এই চুক্তিতে হামলার জবাব কেমন হবে তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সহায়তার অনুরোধ জানাতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তাও নির্দিষ্ট করতে হবে। সহায়তার পরিধি গোয়েন্দা তথ্য ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে গোলাবারুদ বা সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
নতুন এই জোটের আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে থাকবেন তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানরা। সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে একটি স্থায়ী সচিবালয়। যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন ও সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে তিন দেশ। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নিয়ে মক্কায় তিন নেতার বৈঠকে বিশেষ আলোচনা হয়েছে।
তুরস্কের আশ্বাসের পরও ইরানের একাধিক কর্মকর্তা এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান বলেছেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না। সৌদি নেতাদের এ বিষয়টি বুঝতে হবে। একই কমিটির আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি চুক্তিটিকে ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি এই চুক্তির কথা উল্লেখ না করলেও আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একে ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতির কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
ফিদান এই চুক্তিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরা নেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বাইরের কোনো শক্তি এসে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং তা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে তিনি এই উদ্যোগের ‘মূল দেশ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আঙ্কারা এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করতে চায় বলে স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের প্রেসিডেন্টের ভাবনা অনুযায়ী, তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; পরিধি বাড়িয়ে সব দেশকে এই ছাতার নিচে আনা উচিত।
ফিদান জানান, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ এই উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাঁর আশা, ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করা মিসরও যোগ দেবে। তবে তার আগে কিছু কারিগরি বিষয়ের নিষ্পত্তি করতে হবে। এখনো চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের অনেক বিষয় চূড়ান্ত নয়, যেমন—সংকটকালে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে। তবে পরিকল্পিত কমিটি, স্থায়ী সচিবালয় এবং সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এটিকে শুধু পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রাখার ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।




