আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করার সম্ভাবনা এখন প্রায় চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র শনিবার প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগদানের আশা কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মন্তব্য করছে।

বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে এই আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তার জের ধরেই এই সিদ্ধান্ত বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

উল্লেখ্য, ব্রিকস হলো অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উদীয়মান ১১টি দেশের জোট, আর বিমসটেক হলো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা সংস্থা। ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে সাধারণত সদস্য নয় এমন নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা যেন দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ না নেয়, সেজন্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে দুই দেশই। উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করা যায়, সে বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামীকাল সোমবার এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে আজ রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক হওয়ার কথাও রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে এই বৈঠকগুলোতে আলোচনা হতে পারে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে প্রত্যাশিত গতি পায়নি। সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের কথা বলা হলেও পারস্পরিক আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগে ঘাটতি ছিল বলে তারা মনে করছেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর সেই ঘাটতি পূরণ করে সম্পর্ককে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই এখন দুই দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া ভাষায় নিজেদের অবস্থান জানায়। দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়াকে সরকার ইতিবাচকভাবে নেয়নি—বিষয়টি স্পষ্টভাবে ভারতের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।

এরই মধ্যে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেশটির মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যকে ঢাকায় ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে জয়সোয়াল বলেন, ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে, তা ভারত সরকার অনুমোদন করে না। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারতের এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও দুই দেশ সম্পর্ককে আরও অবনতির দিকে নিতে আগ্রহী নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা, অভিন্ন স্বার্থ এবং একে অন্যের সংবেদনশীল বিষয়ে সতর্ক থাকার ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে।

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, ভারত যদি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন; মনে রাখতে হবে, দুটো বিপরীত। আশা করি, ভারতের কর্তৃপক্ষ ও ভারত সরকার বিষয়টি বুঝবে।' তিনি ভারতকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া এবং বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে সমর্থন না দেওয়ার আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দুর কূটনীতি–বিষয়ক সম্পাদক সুহাসিনি হায়দার গতকাল এক বিশ্লেষণে বর্তমান উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক পথে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের দেশে ফিরবেন, নাকি তৃতীয় কোনো দেশে যাবেন—এটা একান্তভাবে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। তবে এ মুহূর্তে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিষয়ে ভারতকে মনোযোগী হতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।