মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কিউবার এমন একজন বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, যাঁকে হাভানার সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাজি করানো যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিউবার পুরো শাসনব্যবস্থা বদলে ফেলার চেয়ে বরং বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে নেতৃত্বে রদবদল আনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে হোয়াইট হাউস। ভেনেজুয়েলায় যে কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল, এখানেও সেই পথেই হাঁটতে চাইছে তারা।

গত জানুয়ারিতে মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটকের পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় দেলসি রদ্রিগেজকে। ওই সময় মার্কিন কর্মকর্তারা রদ্রিগেজকে 'বাস্তববাদী' নেতা হিসেবে দেখেছিলেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারবেন। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কিউবাতেও এমনই একজন নেতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা।

তবে গোয়েন্দা মহলের মূল্যায়ন বলছে, কিউবার বর্তমান পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার চেয়ে ইরানের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল ঘটানো বা 'বাস্তববাদী' বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি কঠিন। দেশটির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো যদি কোনোভাবে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত এমন কর্মকর্তা খুবই কম আছেন। অন্তরালে থাকা সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা ইরানের মতোই আরও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে নানা ওঠানামা দেখা গেছে। কখনো কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে, আবার কখনো ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা নিয়েও এগিয়েছে। সম্প্রতি কিউবার নেতাদের কাছে কিছু দাবি উপস্থাপন করেছে মার্কিন কর্মকর্তারা। কিউবা যদি সেই দাবিগুলোতে অগ্রগতি দেখায়, তাহলে কিছু প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতির আরও উদারীকরণ, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার উন্মুক্ত করা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনা এবং রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের বহিষ্কার। প্রণোদনার মধ্যে আরও মানবিক সহায়তা এবং কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

কিউবা সরকার অবশ্য এই দাবিগুলো মেনে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। তারা কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের ঘোষণা দিলেও তা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা পূরণ করছে না। কিউবা সরকার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ফিদেল কাস্ত্রোর ভাইয়ের নাতি অস্কার পেরেজ-অলিভা ফ্রাগাকে এগিয়ে দিচ্ছে, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ও সরকারি অনুষ্ঠানে বেশি দেখা যাচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকেও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন বরং রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল জি রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে বিবেচনা করতে পারে, যিনি দীর্ঘদিন রাউল কাস্ত্রোর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিলেন। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাসারো আলবের্তো আলভারেজ কাসাসও মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। চলতি বছর সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ কিউবা সফরে এই দুজনের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেছেন।

ইরানে শাসন পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে প্রসঙ্গে। ইরানে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার সময় ইসরায়েল সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বিবেচনা করেছিল। যদিও আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইসরায়েলকে ধ্বংসের আহ্বান জানিয়েছিলেন, পদ ছাড়ার পর তিনি ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের সমালোচক হয়ে ওঠেন। ফলে ইসরায়েল তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। আহমাদিনেজাদ ইসরায়েলের প্রস্তাবে বিরূপ হয়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছে। আগে মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রকে আটক অভিযানের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা হয়েছিল। কিউবা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে সিআইএ গোপনে একটি 'কিউবা টাস্কফোর্স' গঠন করেছে। এতে বোঝা যায়, কিউবা সরকারের ওপর জোরালো চাপ প্রয়োগের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন। অবরোধের কারণে জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত কিউবায় নেতৃত্ব পরিবর্তনে প্রশাসন কতটা এগোতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।