মৌলভীবাজার শহর থেকে উত্তরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে কাদিপুর ও অন্তেহরি গ্রামের কাছে পৌঁছালে বর্ষার কাউয়াদীঘি হাওরের অপার জলরাশি দৃষ্টি জুড়ায়। রোববার মেঘলা বিকেলে একপশলা বৃষ্টির পর ভেজা পথ পেরিয়ে এখানে আসতে হয় জলে পা ডুবিয়ে কিংবা নৌকায় চড়ে। কাদিপুর অটোরিকশা স্ট্যান্ডের কাছেই এক মাঝি নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বর্ষায় এই নৌকাই অনেক বসতবাড়িতে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা। আবার হাওর ভ্রমণে আসা দর্শনার্থীদের জন্যও এসব নৌকাই জলপথে ঘোরার মাধ্যম, যা ঢেউয়ের দুলুনিতে হাঁসের মতো ভেসে বেড়ায়।
আষাঢ়ের মেঘলা বিকেলে হাওরের জলে ঘন মেঘ ও তীরবর্তী গাছপালার ছায়া পড়েছে। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় মেঘের নিচে আঁকা কালচে সবুজ রেখা। কাদিপুর গ্রামের ছোট খাল থেকে অনেক নৌকা হাওরের দিকে যাচ্ছে, কেউবা মাছ ধরে ফিরছে। পুঁটি, মলা, ট্যাংরা ও চিংড়ির মতো ছোট মাছের ওপর ভিত্তি করেই চলে অনেকের জীবন-জীবিকা। এক স্কুলপড়ুয়া কিশোর জানায়, সে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, নিজেদের খাবারের জন্য মাছ ধরতে যাচ্ছে। পূর্ব আকাশে খানিক সময়ের জন্য রংধনুর একটি টুকরো দেখা দিয়ে মিলিয়ে যায়।
এদিকে কাদিপুর কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে জটলা বেঁধেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দিনের কাজ শেষে মাছ ধরা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ ফুটবল পর্যন্ত নানা বিষয়ে তাদের আড্ডা জমে ওঠে। হাওরের বুকে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছে হাঁসের ঝাঁক। তবে এই নয়নাভিরাম রূপের আড়ালে কিছু ক্ষতিও লুকিয়ে আছে। সম্প্রতি হঠাৎ আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে অনেক কৃষকের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে, তাদের কথায় সেই হারানোর হাহাকার স্পষ্ট। তবু চেনা মাঠ-ঘাট আর হাওরকে ঘিরেই তাদের জীবনপ্রবাহ, তাই ক্ষতির কষ্ট সামলে তারা আশপাশের গ্রামগুলোর বর্ষার সৌন্দর্যের কথাই বেশি বলে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দা গৌরা নমশূদ্র, মো. লকনু মিয়া ও ব্যবসায়ী আবদুল মুহিত জানান, বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাউয়াদীঘি হাওর জলে পরিপূর্ণ থাকে। এ সময় হাওরপারের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় পানি উঠে যায় এবং রাস্তাঘাট ডুবে যায়। নৌকা ছাড়া বাইরে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্তেহরিসহ জলের গ্রামগুলোতে যাদের নিজস্ব নৌকা নেই, তাদের চলাফেরা ও গবাদিপশুর ঘাস সংগ্রহের জন্য প্রতি মাসে অন্তত দুই হাজার টাকা ভাড়ায় নৌকা নিতে হয়।
সন্ধ্যা নামার ধীর গতির সঙ্গে সঙ্গে কাকের দল আকাশে ফিরছে, দু-একটি বক আর চিল উড়ছে। কচুরিপানা সরিয়ে নৌকাগুলো পাড়ে ভিড়ছে। গবাদিপশু নিয়ে গেরস্তরা বাড়ি ফিরছেন। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আভা মেঘের গায়ে রঙ ছড়িয়ে দেয়, যা দিনের শেষ মুহূর্তে হাওরের রূপকে এক করুণ মাধুর্যে ভরিয়ে তোলে।




