মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের উত্তর পাশের সরু ফুটপাতটি এখন হকার আর ভ্রাম্যমাণ দোকানে পরিপূর্ণ। সোমবার বিকেলে সেখান দিয়ে হাঁটতে গিয়ে অন্য পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে ফেরদৌসী শেফার ব্যাগ ফুটপাতে পড়ে যায়। উত্তরা থেকে প্রতিদিন মেট্রোরেলে করে মিরপুরে কর্মস্থলে যাতায়াত করা এই যাত্রী জানান, হাঁটার মতো জায়গাই নেই। ফুটপাতের পুরোটাই চা-শিঙাড়া, চটপটি, কাপড় ও নানা পণ্যের দোকানে ভরাট। একে অপরকে পাশ কাটাতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।
প্রতিবেদক দোকান বসাতে আগ্রহী হকার পরিচয়ে কথা বললে স্থানীয় হকাররা ‘আবুল’ নামের এক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সোমবার বিকেলে মেট্রোস্টেশনের নিচে নতুন দোকান বসানোর কাজ করছিলেন আবুল। তিনি প্রথমে জানতে চান কী ধরনের দোকান হবে। চায়ের দোকানের কথা বলতেই তিনি বলেন, ‘চা দোকান দিলে ২০ হাজার টেকা লাগব।’ অন্য ধরনের দোকানের জন্য কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তাঁর জবাব, ‘অন্যডি বসাইলে ৩০ হাজার লাগব।’ টাকা কিছুটা কমানোর অনুরোধ করায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘মাইনষে পজিশন পায় না, আপনে আইছেন কমাইতে। এক টেকাও কম হইব না।’ তিনি আরও জানান, অগ্রিম টাকার পাশাপাশি প্রতিদিন বিদ্যুৎ-সংযোগ ও নিরাপত্তার জন্য আরও ১৫০ টাকা দিতে হবে। সিঁড়ির ঠিক সামনে দোকান বসাতে চাইলে অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা এবং প্রতিদিন ৩০০ টাকা দিতে হবে। উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে আবুল জানান, অভিযান হলে আগের দিনই দোকানিদের সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়।
শুধু মিরপুর-১০ নয়, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও মতিঝিল স্টেশন ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। মতিঝিল স্টেশনের নিচে ও আশপাশের ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেছে। কোথাও চা-সিগারেটের দোকান, কোথাও খাবারের স্টল, আবার কোথাও পোশাক ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান। এতে পথচারীদের হাঁটার জায়গা অনেকটাই সংকুচিত। ব্যস্ত সময়ে স্টেশন থেকে বের হওয়া বা প্রবেশ করা যাত্রীদের এসব দোকানের ফাঁক গলে চলাচল করতে হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, এসব ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি। তাঁদের অনুমতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই বেশির ভাগ ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো হয়।
ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ৩০ জুন কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে, ১৪ জুন কারওয়ান বাজার স্টেশনে এবং ২ জুন উত্তরা উত্তর ও উত্তরা সেন্টার স্টেশনের নিচে অভিযান চালানো হয়। ডিএমটিসিএলের উপপ্রকল্প পরিচালক আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, ‘যেসব ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ হকার বসে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
তবে পথচারী ও নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযান শেষ হওয়ার পরেই হকাররা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহবাগ স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাতের কয়েকজন হকার জানান, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান হওয়ার আগে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা আগাম খবর পেয়ে যান। তখন দোকানপাট ও মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রেখে দেন। অভিযান শেষ হলে আবার আগের জায়গায় দোকান বসিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযানের দাবি থাকলেও বাস্তবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর নিচের ফুটপাত এখনো হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলেই রয়েছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে প্রতিদিন লাখো পথচারী ও মেট্রোরেলের যাত্রীদের।




