গত শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা সোনার বাংলা ট্রেনে হঠাৎ করেই যাত্রীদের মাঝে উপস্থিত হন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। কক্সবাজার রেললাইন পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে তিনি নিজ কেবিন থেকে বেরিয়ে যাত্রীবগিতে প্রবেশ করেন এবং সরাসরি যাত্রীদের কাছ থেকে রেলসেবার মান সম্পর্কে জানতে চান। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হওয়া এই সাক্ষাতে যাত্রীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি ও পরামর্শ তুলে ধরেন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী দেবাশীষ দত্ত খাবারের মান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, প্রায়ই ট্রেনে বাসি খাবার পরিবেশন করা হয় এবং একবার তা খেয়ে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রতিমন্ত্রী। কুড়িগ্রামের বাসিন্দা রাজউকের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার জানান, কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা যাত্রীদের সংখ্যা অনেক কিন্তু সেখানে মাত্র একটি ট্রেন চলাচল করে। তিনি ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে ট্রেন সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই রেলপথে কাজ চলছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) সুবক্তগীন জানান, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ প্রকল্প শেষ হলে ওই পথে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান রেললাইনের কারণে বন্যার পানি নিষ্কাশনে সমস্যার কথা তুলে ধরেন। উত্তরে প্রতিমন্ত্রী জানান, তিনি কক্সবাজার থেকে গ্যাংকারে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পরিদর্শন করেছেন এবং কালভার্টগুলো চওড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আশা করেন, ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হবে।
শনিবার চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় আসে। শিক্ষানবিশ আইনজীবী মো. রবিউল হোসেন অভিযোগ করেন, ওই সময় স্টেশনে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না, এমনকি স্ট্রেচারও পাওয়া যায়নি। তিনি প্রতিমন্ত্রীর কাছে স্টেশনে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রাখার অনুরোধ জানান। মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগীন স্বীকার করেন, স্টেশনে স্ট্রেচার রাখা হয় না। প্রতিমন্ত্রী জানান, কমলাপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় স্টেশনগুলোতে মেডিক্যাল সার্ভিস রাখার বিষয়টি মন্ত্রণালয় বিবেচনা করবে।
ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব কমাতে কর্ডলাইন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন শিপিং ব্যবসায়ী আবু জাফর মো. ওয়ালিউল্লাহ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে এবং সময় দিতে হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হাসিবুর রহমান রেলসেবায় উন্নতির ধারা বজায় রাখার পরামর্শ দেন। প্রতিমন্ত্রী তাকে জানান, ট্রেনে ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় চিন্তাভাবনা করছে।
হাইকোর্টের আইনজীবী শংকর প্রসাদ দে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় দিনে তিনটি আন্তনগর ট্রেন গেলেও ঢাকা থেকে আসে মাত্র একটি সুবর্ণ এক্সপ্রেস—এমন তথ্য দেন এবং টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ তোলেন। মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগীন লোকোমোটিভের অপ্রতুলতার কথা জানালে প্রতিমন্ত্রী ঢাকা থেকে কমপক্ষে দুটি ট্রেন দেওয়ার কথা বলেন।
জার্মান একটি সংস্থায় কর্মরত মাজহারুল ইসলাম ট্রেনের কেবিনে দেওয়া নোংরা চাদরের অভিযোগ তোলেন। প্রতিমন্ত্রী মহাব্যবস্থাপককে বলেন, এগুলো সহজেই ঠিক করা যায়। সুবক্তগীন জানান, নতুন চাদরের জন্য টেন্ডার করা হয়েছে এবং শিগগিরই সমাধান হবে।
প্রতিমন্ত্রী মোট ১৯টি যাত্রীবগি ঘুরে ক্যানটিনেও যান। সেখানে বাসি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভিযোগ শুনে তিনি ক্যানটিন ব্যবস্থাপককে সতর্ক করে দেন এবং বলেন, এমন অভিযোগ পেলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেলে বড় পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে, তবে বর্তমান সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে ভ্রমণ করে তাদের সমস্যা শুনছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানান। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. আলী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে পরিচ্ছন্নতা ও টয়লেটের মান বেড়েছে, তবে ট্রেন সংখ্যা ও টিকিটের প্রাপ্যতা এখনও বড় সমস্যা।




