যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক দলের সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাক্কালে ইসরায়েলপন্থী সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ডিয়ারবোর্নের এক নির্বাচনী জনসভায় সমর্থকদের ‘আইপ্যাক নিপাত যাক’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ স্পষ্ট হয়। এখানে প্রগতিশীল প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের সমর্থন ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে বিপুল অর্থায়নের ঘটনা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ ইসরায়েল নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রাজ্য আইনসভার সদস্য আলাবাস ফারহাত ওই জনসভায় মন্তব্য করেন, ভোটাররা আল-সাইয়েদকে জিতিয়ে এই লবি গ্রুপের লাখ লাখ ডলার জলে ফেলবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে সরকার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ সংকটের কথা বললেও গাজায় বোমা ফেলতে বা দক্ষিণ লেবাননে জাতিগত নিধন অভিযানের জন্য বরাদ্দ খুঁজে পায়। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমরের উপস্থিতিতিতে এই জনসভায় স্টিভেন্সের নাম কমই আলোচিত হয়, বরং বারবার আইপ্যাকের প্রতি নিন্দা ও দুয়ো ধ্বনি দেওয়া হয়।
অবসরপ্রাপ্ত সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে লড়ছেন সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল-সাইয়েদ ও চার মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য স্টিভেন্স। এই বাছাইয়ে জয়ী ব্যক্তি নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান মাইক রজার্সের মোকাবিলা করবেন। ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইপ্যাক ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) স্টিভেন্সকে জেতাতে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারর বেশি খরচ করেছে। পাশাপাশি ‘সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক প্রায়োরিটিজ’ নামক এক ‘ডার্ক মানি’ গ্রুপ আরও ৬৫ লাখ ডলার খরচ করায় মোট ব্যয় ৬ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
আইপ্যাকের নির্বাচনী শাখা ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (ইউডিপি) একাই ৩ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করে রেকর্ড গড়েছে। এই পিএসির অর্থের বড় অংশই এসেছে আইপ্যাকের তহবিল থেকে, যা একটি সামাজিক কল্যাণমূলক অলাভজনক সংস্থা হিসেবে এর মূল দাতাদের পরিচয় গোপন রাখে। ধনী ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তিরাও ইউডিপি বড় অংকের তহবিল দিয়ে থাকেন। বাকি প্রায় ৩ কোটি ডলার এসেছে বিভিন্ন পিএসি ও ডার্ক মানি গ্রুপ থেকে, যা একাধিক স্তরের সংগঠনের জালে দাতার পরিচয় আড়াল করেছে, অনেকটা রুশ পুতুলের মতো। ‘এ স্ট্রংগার মিশিগান’ নামে একটি গোষ্ঠী ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করে, যার পেছনে ছিল ‘সেন্টার ফরওয়ার্ড’সহ আরও বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থা ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী।
অন্যদিকে, আল-সাইয়েদ সরাসরি অনুদানে ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার সংগ্রহ করে এগিয়ে থাকলেও, নিরপেক্ষ ব্যয় হিসেবে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩৫ লাখ ডলার। এর বেশিরভাগই এসেছে ‘ফাইটিং ফর মিশিগান’ নামক প্রগতিশীল গোষ্ঠীর থেকে, যেখানে তার শ্বশুর ও ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যর্থ প্রার্থী সৈকত চক্রবর্তীও অনুদান দিয়েছেন। কিছু লেবার ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল সংগঠন তাকে সমর্থনে ছোটখাটো প্রচার চালিয়েছে।
সম্প্রতি এক বিতর্কে স্টিভেন্স তার পক্ষে আইপ্যাকের খরচকে তুচ্ছ করে উভয় পক্ষের সুপার প্যাক আসার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য দেখেন না বলে মন্তব্য করেন। তবে তার ওয়েবসাইটে ভোটারদের জন্য আইপ্যাক ও পিএসিগুলোর দেওয়া নির্দেশনামূলক ভিডিও ও বার্তা দেখা গেছে, যা বারাক ওবামার সঙ্গে তার কাজের বিষয়টি তুেছে ধরেছে। আল-সাইয়েদ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, এই বিনিয়োগের বদলে স্টিভেন্স ইসরায়েলে করদাতার ৩৩০ কোটি ডলার পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তার মতে, ট্রাম্প কোনো রোগ নন, বরং সেই ব্যবস্থার উপসর্গ যা কোটিপতি, করপোরেশন ও আইপ্যাককে রাজনীতিকদের কিনতে দেয়।
আইপ্যাক নিজেদের সচেতন আমেরিকানদের জোট দাবি করে এবং গাজা ও ইরানে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির সমর্থন অব্যহত রেখেছে। সংগঠনটি ইমেইলে মিশিগানের এই নির্বাচনকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করে এবং নিজেদের অংশগ্রহণে ক্ষমা না চাওয়ার অঙ্গীকার করে। ফিলিস্তিনি অধিকার আন্দোলনকর্মীদের মতে, জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা আল-সাইয়েদ জয়ী হলে তা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী প্রচারণার জন্য বড় ধাক্কা হবে। মিশিগানের এই লড়াই সিনেটের নিয়ন্ত্রণও নির্ধারণ করতে পারে।




