সম্প্রতি জাতীয় সংসদে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজকে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সক্ষমতা বাড়ানোই বেশি জরুরি। দেশে বর্তমানে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও তার মধ্যে ২২টি ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রায় ২০টিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণাগার ও ছাত্রাবাসের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যার দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও গুণগত মান সমানতালে বাড়েনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে বলা হয়, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার দুই দশক পরও সেটি অবকাঠামো ও বাজেট সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইডেন মহিলা কলেজ উপমহাদেশের নারীশিক্ষার অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ২৩টি বিভাগে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য সুলভ, নিরাপদ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে এটি নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির একটি সংযুক্ত কলেজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই নতুন কাঠামো ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়ার পথে থাকা অবস্থায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ নতুন করে অনিশ্চয়তা ও সেশনজট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ ও অ্যামহার্স্ট কলেজ এবং যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ‘কলেজ’ নাম ধরে রেখেই বিশ্বসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেন কলেজ ও মিরান্ডা হাউস কলেজও নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখে একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জন করেছে। লেখকের মতে, প্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষ তার নামের ওপর নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ২ শতাংশ, যেখানে গবেষণার জন্য বরাদ্দ মাত্র ১.৮৪ শতাংশ। এই সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। হুট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করলে ইডেন কলেজের বর্তমান আসনসংখ্যা কমে যাবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফি ও প্রবেশের বাধা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লেখক সৌরভ জাকারিয়া তার বিশ্লেষণে বলেন, ইডেন কলেজ দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ‘কলেজ’ হিসেবেই অনন্য সুনাম ও ঐতিহ্য অর্জন করেছে। একে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে বর্তমান শক্তিকে আরও বিকশিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তিনি প্রস্তাব করেন, ইডেন কলেজকে নারী উচ্চশিক্ষার জাতীয় ‘কলেজ অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলা হোক, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, আধুনিক গ্রন্থাগার, যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি চালু করা সম্ভব। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আওতায় থেকেই কলেজটিকে একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রের শিক্ষানীতিতে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা ও গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।




