জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকৃতির রূপ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়া হয়ে উঠছে চরম ভাবাপন্ন। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করে জানিয়েছে যে, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এখন আর আগের মতো ক্ষণস্থায়ী নেই; বরং এগুলো দিন দিন আরও দীর্ঘমেয়াদী ও তীব্র হয়ে উঠছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, তাপপ্রবাহের প্রকোপও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি অনেক বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্তমানে ইউরোপ মহাদেশটি পঞ্চম দফায় গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ চরম খরা, দাবানল এবং রেকর্ড পরিমাণ উচ্চ তাপমাত্রায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার জলবায়ু তথ্যপ্রধান জন কেনেডি উল্লেখ করেন যে, অতীতের শীতল জলবায়ুর সময়ের তুলনায় বর্তমানের তাপপ্রবাহ অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে এবং এর স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। সেখানে চলমান এই তীব্র গরম মূলত উষ্ণ জলবায়ু এবং বায়ুমণ্ডলের উচ্চচাপ বলয়ের সম্মিলিত প্রভাবের ফল। এই উচ্চচাপ বলয় গরম বাতাসকে নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখে এবং শীতল বাতাসের প্রবেশ পথে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে মেঘের পরিমাণ কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল এলাকা জুড়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
সাধারণত প্রাকৃতিক 'এল নিনো'র কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে এল নিনো দায়ী নয়। কারণ ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি বর্তমানে নিরপেক্ষ বা স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। জন কেনেডি ১৯৭৬ সালের জুনের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সাথে বর্তমান সময়ের তুলনা করে বলেন, তৎকালীন এবং বর্তমানের উচ্চ ও নিম্নচাপের ধরন একই রকম হলেও ফলাফলের আকাশ-পাতাল তফাত। ১৯৭৬ সালে পৃথিবী তুলনামূলক শীতল ছিল, ফলে কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা বেশি ছিল। কিন্তু কয়েক দশকের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এখন চিত্রটি উল্টো; বিশ্বের অধিকাংশ জায়গায় তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে বেশি এবং খুব অল্প কিছু জায়গায় শীতল আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে।
এছাড়া ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলীয় সমুদ্র ও ভূমধ্যসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং স্থলের শুষ্ক মাটি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় তা দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা স্থলভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। চলতি বছরের রেকর্ড গরমের পেছনে এই সমস্ত বিষয়গুলো একত্রে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কেনেডি।




