প্রকৃতির বুকে ঘুরতে গিয়ে অনেক সময় এমন সব ফলের দেখা মেলে, যাদের নাম শহুরে প্রজন্মের কাছে অজানা। তেমনই দুটি ফল হলো ডেউয়া ও চামকাঁঠাল। দেখতে কিছুটা কাঁঠালের মতো হলেও এরা আলাদা। কেউ কেউ প্রথম দেখায় মনে করতে পারেন এ দুটি একই ফল, কিন্তু নিবিড়ভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায় এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। দেশের গ্রামাঞ্চলে বহুদিন ধরেই এই দুই ফল পরিচিত, অথচ শহরের কিশোর-কিশোরীদের অনেকেই হয়তো নামটিও শোনেননি।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই দুই ফলই মোরাসি বা Moraceae পরিবারের সদস্য, যে পরিবারে কাঁঠাল, ডুমুরও রয়েছে। তবে একই পরিবারভুক্ত হলেও এদের স্বাদ, চেহারা আর ব্যবহারে রয়েছে বিস্তর ফারাক। পরিবারের ভাইবোনের মতো কিছুটা মিল থাকলেও স্বভাবে এরা একেবারে ভিন্ন। ডেউয়ার বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus lacucha, আর চামকাঁঠাল Artocarpus chama নামে পরিচিত।
ডেউয়া মূলত টক ফল হিসেবে পরিচিত, গ্রামবাংলার রান্নাঘরে এর আচার-চাটনি তৈরিতে ব্যবহার হয় বহুকাল ধরে। কাঁচা অবস্থায় এর টকভাব প্রবল, পাকলে রং হলুদ থেকে কমলা হয়ে যায়। খোসা অমসৃণ, কাঁটাহীন, কিন্তু আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলে খসখসে অনুভূতি পাওয়া যায়। এর ভেতরে নরম রসাল শাঁস আর কিছু বড় বীজ থাকে। গাছও বড়সড়, পাতা প্রশস্ত। শীতের আগে ঘরে ঘরে ডেউয়ার আচার তৈরি করে রোদে শুকিয়ে বয়ামে ভরে রাখার যে স্মৃতি প্রবীণদের মনে আছে, তা এখন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে চামকাঁঠাল আকারে ছোট হলেও দেখতে কাঁঠালের মতোই। ছোট্ট এক কাঁঠালের প্রতিকৃতি যেন, গায়ে কাঁটাযুক্ত খোসা স্পষ্ট। পূর্ণবয়স্ক কাঁঠাল ১০ থেকে ১২ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে, কিন্তু চামকাঁঠাল হাতের মুঠোয় ধরা যায় এমনই ছোট। খোসায় ছোট ছোট শঙ্কু আকৃতির অভিক্ষেপ থাকে, স্পর্শ করলে খোঁচা লাগে। স্বাদে এটি সম্পূর্ণ মিষ্টি, টকের কোনো ভাব নেই। পাকা ফল হিসেবে খাওয়া যায়, আবার কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবেও রান্না করা হয়, যেমনটা কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তরকারি রান্না হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে এই ফলের বেশি দেখা মেলে, বিশেষত সিলেট আর চট্টগ্রামের টিলাভূমি-বনাঞ্চলে, সমতলের বাজারে তেমন চোখে পড়ে না।
এই দুই ফলের পার্থক্য চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো খোসা দেখে। ডেউয়ার খোসা রুক্ষ, খসখসে কিন্তু কাঁটাহীন, পাকা পেঁপের গায়ের মতো অনুভূতি হলেও রুক্ষতা কিছুটা বেশি। চামকাঁঠালের খোসায় কাঁটা স্পষ্ট এবং হাত বোলালেই খোঁচা লাগে। স্বাদেও একই রকম ফারাক; ডেউয়া টক-মিষ্টি হলেও কাঁচা অবস্থায় টকভাবই বেশি, তাই আচার-চাটনিতে এর কদর। আর চামকাঁঠাল সম্পূর্ণ মিষ্টি। আকারেও তফাত স্পষ্ট, ডেউয়া মাঝারি গোলাকার আর চামকাঁঠাল ছোট কাঁঠালের প্রতিরূপ।
শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানেই নয়, গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে এই দুই ফলের নিজস্ব জায়গা রয়েছে। তবে শহুরে বাজারে এই স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। সুপারশপে আপেল-কমলা যেমন সহজলভ্য, ডেউয়া বা চামকাঁঠাল তেমন নয়। অথচ একসময় মৌসুমি খাদ্যচক্রে এই ফলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্ষার আগে-পরে গাছ ভরে উঠত ফলে, শিশুরা গাছতলায় জড়ো হতো পাকা ফল কুড়াতে। সেই দৃশ্য এখন স্মৃতির খাতায়।
Artocarpus গোত্রে ৫০টিরও বেশি প্রজাতি থাকলেও কাঁঠালই সবচেয়ে পরিচিত। ডেউয়া, চামকাঁঠালের মতো প্রজাতিগুলো স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে নীরবে ভূমিকা রাখে। পাখি, বাদুড়, বনের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এই ফলের উপর নির্ভরশীল। ফল খেয়ে তারা বীজ ছড়িয়ে দেয় বনের নানা প্রান্তে, প্রকৃতির নিজস্ব চক্র চলতে থাকে নীরবেই। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব স্থানীয় ফল নিয়ে গবেষণা বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। বন উজাড়, পাহাড়ি জমি চাষাবাদের জন্য পরিষ্কার করার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে এমন সব গাছ, যা একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি আর খাদ্যচক্রের অংশ ছিল।
কিশোর বয়সে এই ফলগুলো চেনার সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে সংরক্ষণের প্রয়োজনটা অনুভব করা সহজ হবে। কোনো গ্রামীণ হাটে বা পাহাড়ি বাজারে হলুদাভ, খসখসে খোসার ফল দেখলে বুঝে নেওয়া যাবে সেটা ডেউয়া। আর ছোট্ট কাঁঠালের মতো গায়ে কাঁটা ও ভেতরে মিষ্টি শাঁসের ফল দেখলে সেটা চামকাঁঠাল। নাম দুটো শুনতে একরকম লাগলেও, জন্ম একই গোত্রে হলেও হাতে নিলে বা স্বাদ নিলে ফারাক টের পাওয়া যায়। গাছতলায় পড়ে থাকা একটা ফল কতটুকুই বা তার গল্প, কিন্তু সেই ছোট্ট চেনাটুকু থেকেই হয়তো বনকে আসলে চেনার সূচনা।




