আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ৮১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই দাম গতকাল সকালের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ ডলার এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ দশমিক ৫০ ডলার বেশি। এক মাস আগেও তেলের দাম ছিল ৭২ দশমিক ৬৫ ডলার, যা এখন ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের এই সময়ে তেলের দাম ছিল ৬৯ দশমিক ৩১ ডলার, এখন তা ২৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সরবরাহ ও চাহিদার ওপরই মূলত নির্ভর করে এই বাজার। তবে যুদ্ধ, মন্দা বা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়লে তেলের দাম দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। গত কয়েক দশকের ইতিহাস বলছে, তেলের দাম কখনো স্থিতিশীল ছিল না। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট, বৈশ্বিক মন্দা এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের কারণে দাম কখনো তীব্রভাবে বেড়েছে, আবার কখনো নাটকীয়ভাবে কমেছে।

পাম্পে জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেলের দাম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। তবে পাম্পে জ্বালানি কিনতে গেলে ক্রেতাদের শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই দিতে হয় না, বরং এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিশোধন, পাইকারি, কর এবং স্থানীয় পেট্রোল পাম্পের মুনাফা। তারপরও অপরিশোধিত তেলের দামই গ্যালন প্রতি জ্বালানির খরচের অর্ধেকের বেশি নির্ধারণ করে। তেলের দাম বাড়লে সাধারণত জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ে, কিন্তু দাম কমলে জ্বালানির দাম অনেক ধীরে কমে—এই প্রবণতাকে ‘রকেটস অ্যান্ড ফেদারস’ বলা হয়।

জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিষেধাজ্ঞা, ঘূর্ণিঝড় বা যুদ্ধের মতো দুর্যোগের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই মজুত ব্যবহার করা হয়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান নয়, বরং ভোক্তাদের দ্রুত স্বস্তি দিতে এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে সচল রাখতে সহায়তা করে।

তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। তেলের দাম বেড়ে গেলে অনেক শিল্প প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদা ও দামও বেড়ে যায়। তেলের বাজার বিশ্লেষণে দুটি প্রধান মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়: ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)। এর মধ্যে ব্রেন্টকে বিশ্ববাজারের প্রধান সূচক হিসেবে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনও এখন তাদের বার্ষিক জ্বালানি পূর্বাভাসে ব্রেন্টকে প্রাথমিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে।

গত কয়েক দশকে তেলের দামের ওঠাপড়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য রপ্তানি কমিয়ে দিলে প্রথম বড় তেল সংকট দেখা দেয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং অ-ওপেক দেশগুলোর উৎপাদন বাড়ায় দাম কমে যায়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী চাহিদা বাড়ায় দাম আবার আকাশছোঁয়া হয়, কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণে তা ধসে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির কারণে লকডাউনের সময় তেলের চাহিদা অভূতপূর্বভাবে কমে গিয়ে দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের নিচে নেমে যায়।

তেলের বর্তমান দাম নির্ধারণে মূলত সরবরাহ ও চাহিদা ভূমিকা রাখে। ভূরাজনীতি, ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ সম্পর্কিত খবরও বাজারকে প্রভাবিত করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনের নীতি যেমন ড্রিলিং-বান্ধব নীতি তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ ও দামকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমভূমিতে ১৫ লাখ একরের বেশি জমি তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য পুনরায় খুলে দেয়, যা বিডেন প্রশাসনের নীতির বিপরীত ছিল।

তেলের দাম দিনে কতবার পরিবর্তন হয় তা নির্ভর করে ফিউচারস বাজার কখন খোলা থাকে তার ওপর। ফিউচারস বাজারে মানুষ ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তি করে এবং যতক্ষণ চুক্তি চলতে থাকে ততক্ষণ দাম পরিবর্তন হয়। মার্কিন শেল তেল উৎপাদনও তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। শেল থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলে দামের চাপ কমে।

তেলের দাম বাড়লে সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়ে। জ্বালানি খরচ (হিটিং, গ্যাস) সরাসরি বাড়ে, কিন্তু পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ায় দোকানের পণ্যের দাম চড়া হয়। সুপারমার্কেটের তাক পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর জন্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়ে।