ফ্লোরিডার সানি আইলস বিচের সমুদ্রতীরে অবস্থিত পোর্শে ডিজাইন টাওয়ারের বাসিন্দাদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য গ্যারেজে যেতে হয় না। বরং, গ্যারেজই তাদের সঙ্গে ওপরে ওঠে। একটি নলাকার কাঁচের এলিভেটর চালকসহ গাড়িকে ৬০ তলার বেশি উচ্চতায় তুলে নেয়, যা সরাসরি অ্যাপার্টমেন্টের ব্যক্তিগত 'স্কাই গ্যারেজে' পৌঁছে দেয়। সেখানে গাড়িটি একটি কাঁচের দেওয়ালের পেছনে বসার ঘর থেকে দৃশ্যমান থাকে, অনেকটা অটো শোরুমের ডিসপ্লের মতো।
বিলাসবহুল আবাসনের দ্রুত বর্ধনশীল এই খাতটি ‘ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্সেস’ নামে পরিচিত। পোর্শে, বেন্টলে, ফেন্ডি বা নোবুর মতো বৈশ্বিক বিলাস ব্র্যান্ডগুলোর অংশীদারত্বে তৈরি এই অ্যাপার্টমেন্টগুলো এখন ঘরের চেয়ে অনেকটাই থ্রি-ডি ব্র্যান্ড অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজ করে। গ্লোবাল ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্সেস-এর প্রতিষ্ঠাতা রিয়ান ইতানি বলছেন, “ব্র্যান্ডগুলোর জন্য একক আবাসন প্রকল্প ভৌগলিক সম্প্রসারণের একটি সুযোগ, যাতে হোটেল উন্নয়নের পরিচালনগত জটিলতা নেই এবং বাড়তি রাজস্বের ধারা তৈরি হয়।”
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যায়ের ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ মার্কাস শায়ের মনে করেন, হাই-এন্ড ব্র্যান্ডগুলো এখন আর কেবল ফ্যাশন, ঘড়ি বা গাড়ি বিক্রি করছে না; তারা বিক্রি করছে একটি কমিউনিটি, নন্দনতত্ত্ব, সেবা দর্শন এবং আবেগিক অভিজ্ঞতার অ্যাক্সেস। এটি ‘ব্র্যান্ড’ থেকে ‘ইকোসিস্টেমে’ উত্তরণেরই নামান্তর।
মায়ামিতে অ্যাস্টন মার্টিন রেসিডেন্সেস থেকে দুবাইয়ের ফেন্ডি-ডিজাইন করা অ্যাপার্টমেন্ট, ম্যানহাটনে নোবুর রেসিডেন্সেস — সর্বত্রই এ ধারা দৃশ্যমান। নোবুর আবাসনে থাকার পরেও ভবনের নিচের নোবু রেস্টুরেন্টে টেবিলের জন্য ঘণ্টাব্যাপী অপেক্ষা করতে হয়।
সোথেবি’স ইন্টারন্যাশনাল রিয়েলটির মতে, বিশ্বে এই খাতের মূল্য এখন প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার। গ্লোবাল ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্সের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সারা বিশ্বে সক্রিয় ও পাইপলাইন মিলিয়ে মোট ১,৯০৭টি প্রকল্প ছিল। আগামী দশকে প্রকল্পগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হলে ব্র্যান্ডেড রিয়েল এস্টেটের সরবরাহ দ্বিধিণীতের বেশি হতে পারে।
শুরুটা হোটেল জায়ান্টদের হাত ধরে হলেও এখন অটোমেকার ও ফ্যাশন হাউসগুলো এগিয়ে এসেছে। দুবাইয়ের বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেটের প্রকল্প জিয়াদ এল চার বলছেন, একটি বাড়ি মানুষের জীবনের অত্যন্ত বড় একটি আবেগী পণ্য। ‘আমি যদি ব্র্যান্ড হই, তবে সেই অনুভূতির মালিক হতে চাই।’
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রসার এই খাতের চাহিদায় প্রবল ভাবে জ্বালানি যোগাচ্ছে। এখনকার এক বিলিয়নিয়ার তার ফ্রান্স প্রাসাদ থেকে ভিন্ন — তিনি লাইভে লাখো দর্শকের সামনে তার বিলাসিতা প্রদর্শন করতে পারেন। পোর্শে টাওয়ারের এক বাসিন্দার একটি ভিডিও, যাতে তার সাদা পোর্শে গাড়িটি এলিভিটরে উঠছে, প্রায় ৫ কোটি বার দেখা হয়েছে।
তবে সব ব্র্যান্ডই সফল হচ্ছে না। ‘ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্সেস হাব’-এর প্রধান জেসন পেইন বলেন, শুধু লোগো লাগালে দ্রুত বিক্রি বা দামে প্রিমিয়াম আসে না; ব্র্যান্ডের আসল চেতনা প্রজেক্টে ফুটে উঠতে হবে। যেসব ব্র্যান্ডের অভ্যন্তরীন নকশায় কোনো ডিএনএ নেই, তারা ব্যর্থ হয়। এছাড়া, অবস্থান ও সঠিক মূল্যায়ন সফলতার চাবিকাঠি। ২০-৩০% পর্যন্ত দাম বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু তার বেশি বাড়ানো প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরবর্তী ঢেউয়ে প্রযুক্তি বা ওয়েলনেস ব্র্যান্ডও এই বাজারেও আসতে পারে। অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠান তাদের ডিজাইন দর্শন নিয়ে আসা অসম্ভব নয়। বিলাসিতা এখন আর কেবল পণ্যে নয়, ‘মানবীয় ইন্টারফেস’— যেমন ক্লাব, আবাসন ও আবেগময় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ফরচুন ম্যাগাজিনে।


