কে-পপ জগতে স্থায়ীত্ব বরাবরই জটিল একটি বিষয়। অস্থায়ী গ্রুপ, নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি এবং যেকোনো সময় পরিবর্তন হওয়া সদস্য তালিকা এই শিল্পের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ২০২৬ সালে এই পরিবর্তনগুলো আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বছরের প্রথমার্ধেই চারটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ ও শিল্পীর প্রস্থান কে-পপ ভক্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি উইনউইনের এনসিটি ও ওয়েভি ত্যাগের মাধ্যমে এই ধারা আরও সুস্পষ্ট হলো।

মার্চ মাসের শুরুতেই বড় ধাক্কা আসে এনহাইপেন শিবিরে। ব্যালিভ ল্যাব ১০ মার্চ জানায়, গ্রুপটির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, প্রধান কণ্ঠশিল্পী হিসুং (২৪) একক ক্যারিয়ারের জন্য গ্রুপ ছাড়ছেন। তিনি হাইবের অধীনে থাকা ব্যালিভ ল্যাবেই থাকবেন, তবে আর গ্রুপের অংশ হিসেবে কার্যক্রম চালাবেন না। এনহাইপেন বাকি ছয় সদস্য নিয়ে চলবে। এই ঘোষণা আসে তাদের সপ্তম মিনি-অ্যালবাম 'দ্য সিন: ভ্যানিশ' বিলবোর্ড ২০০-এ দ্বিতীয় স্থানে আত্মপ্রকাশের দুই মাস পর। অ্যালবামটি প্রথম দিনেই ১৬ লাখ ৫০ হাজার কপি বিক্রি করেছিল। হিসুং পরবর্তীতে 'ইভান' নামে একক শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

মার্চের মাঝামাঝিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে জিরোবেসওয়ানের ক্ষেত্রে। ২০২৩ সালে এমনেটের 'বয়েজ প্ল্যানেট' শো থেকে গঠিত এই নয় সদস্যের গ্রুপটি শুরু থেকেই অস্থায়ী ছিল। তাদের চুক্তির মেয়াদ ছিল আড়াই বছর, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। সব সদস্য দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৫ মার্চ সিউলের কেএসপিও ডোমে গ্রুপটি তাদের শেষ কনসার্ট আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানের পর চার সদস্য ঝাং হাও, রিকি, কিম গিউভিন ও হান উজিন তাদের প্রতিষ্ঠান ওয়াইএইচ এন্টারটেইনমেন্টে ফিরে যান। তারা আরেকজন নতুন সদস্যকে নিয়ে 'এন ডাবল' (পরে নাম পরিবর্তন করে এএনডিটুবল) নামে নতুন গ্রুপ গঠন করে। তাদের প্রথম ইপি 'সিকোয়েন্স ০১: কিউরিওসিটি' মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ৭৩ লাখের বেশি কপি বিক্রি করে বাজারে সাড়া ফেলে। বাকি পাঁচ সদস্য কিম জিওং, সুং হানবিন, সিওক ম্যাথিউ, কিম তায়েরা ও পার্ক গনউক ওয়ানওয়ানের অধীনে পুনর্গঠিত জিরোবেসওয়ান হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত প্রস্থানটি ঘটে। এসএম এন্টারটেইনমেন্ট ৩ এপ্রিল ঘোষণা করে, এনসিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও একাধিক ইউনিটে সক্রিয় মার্ক লির একচেটিয়া চুক্তি ৮ এপ্রিল শেষ হচ্ছে। ঠিক ১০ বছর আগে তার আত্মপ্রকাশের দিন। তিনি একইসঙ্গে এনসিটি, এনসিটি ১২৭ ও এনসিটি ড্রিম ত্যাগ করছেন। তার প্রথম একক অ্যালবাম 'দ্য ফার্স্টফ্রুট' ২০২৫ সালের এপ্রিলেই মুক্তি পেয়েছিল, যা ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে রূপান্তরের প্রস্তুতি চলছে। ২৫ সদস্যের এনসিটি পরিবারে দীর্ঘদিন কাটানো মার্ক ফ্যানদের আবেগঘন বার্তায় জানান, "আমি বিশ্বাস করি আমাদের হৃদয় আমাদের চোখের চেয়ে ভালো দেখে। আমার হৃদয় এখন যে দরজা দেখছে তা বন্ধ নয়, বরং খোলা।" জুনের শুরুতে তিনি নিজের লেবেল 'আপার রুম' প্রতিষ্ঠা করেন।

একই সপ্তাহে আরেকটি আংশিক প্রস্থানের ঘটনা ঘটে। মার্কের ঘোষণার তিন দিন পর এসএম এন্টারটেইনমেন্ট জানায়, টেনের একচেটিয়া চুক্তিও ৮ এপ্রিল শেষ হচ্ছে, কিন্তু তিনি এনসিটি বা ওয়েভি ছাড়ছেন না, শুধু লেবেলের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে সরে আসছেন তার একক ক্যারিয়ারের জন্য। ২০১৬ সালে মার্কের সাথেই এনসিটি ইউ-তে আত্মপ্রকাশ করা টেন ইনস্টাগ্রামে লেখেন, "দশম বার্ষিকীর কাছে এসে আমি নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে, নতুন সম্ভাবনা অন্বেষণ করতে এবং নিজের নতুন রূপ আবিষ্কার করতে চাই।" জুলাইয়ে তিনি তার নিজস্ব সৃজনশীল কোম্পানি 'ইলিমন্ট' প্রতিষ্ঠা করেন, যা সঙ্গীত, ফ্যাশন ও কন্টেন্টে কাজ করবে। তিনি এসএম-এর অধীনে এনসিটি ও ওয়েভির কার্যক্রমও চালিয়ে যাবেন বলে জানা গেছে।

এসএম এন্টারটেইনমেন্ট ৮ জুলাই জানায়, উইনউইনের একচেটিয়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আগামীকাল থেকে এনসিটি ও এর উপ-ইউনিট ওয়েভির সদস্য হিসেবে তার কার্যক্রম শেষ হচ্ছে। ২০১৬ সালে এনসিটি ১২৭-এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা উইনউইন ২০১৯ সালে চীনা ইউনিট ওয়েভির অংশ হন। তিনি মার্কের পর সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী সদস্যদের একজন ছিলেন। বাস্তবে উইনউইন বেশ কিছুদিন ধরে ওয়েভির কার্যক্রমে অনুপস্থিত ছিলেন; ২০২১ সালে চীনে নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করে তিনি অভিনয় ও বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানে মনোযোগ দিচ্ছিলেন। তার প্রস্থান আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও বছরের পর বছর ধরে এই সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। ইনস্টাগ্রামে ভক্তদের উদ্দেশ্যে তিনি লেখেন, "২০১৬ থেকে ২০২৬ — ১০ বছর কেটে গেছে... যদিও সময় পেরিয়ে গেছে, সেই ছোট ছোট অমূল্য স্মৃতিগুলো সবসময় আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।" মার্ক ও উইনউইন উভয়ের প্রস্থানের পর ২০১৬ সালে আত্মপ্রকাশ করা এনসিটি লাইনআপ উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে।

কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কে-পপ শিল্পে এ ধরনের ঘটনা নতুন প্রবণতা তৈরি করছে। আগে আইডলদের জন্য বড় এজেন্সির উপর নির্ভরশীল থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সালের মধ্যেই ক্রিয়েটর ইকোনমির বিস্তার এই ধারণা বদলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত শ্রোতা ও ভক্তবেস থাকায় আইডলরা এখন চুক্তির মেয়াদ শেষে নিজের পথ বেছে নিতে পারছেন। কোরিয়া হেরাল্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিজস্ব দর্শক তৈরি করতে পারলে এখন আর শুধুমাত্র এজেন্সির উপর অর্থের জন্য নির্ভর করতে হয় না। বছরের বাকি পাঁচ মাসেও আরও প্রস্থানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।