ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কর্মকারপাড়ায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। সেখানে এক পরিবারের বাড়ির প্রধান যাতায়াতের পথ প্রতিবেশীর বাঁশের বেড়ায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সদস্যরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় কাটাচ্ছেন। তাঁদের ব্যবহৃত শৌচাগারটি নষ্ট করে ফেলা হয়েছে এবং পানির উৎস নলকূপটিও টিন ও আবর্জনায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ৯ আগস্ট। ভুক্তভোগী মন্টু কর্মকারের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিবেশী রফিক মিয়ার লোকজন ওই দিন তাঁদের ঘরের দরজার সামনে এবং উঠানের বের হওয়ার পথে বাঁশের বেড়া দেন। ঘরের সামনের প্রায় ২০ ফুট এবং উঠান থেকে বের হওয়ার প্রায় ২৫ ফুট দীর্ঘ ওই বাধায় তাঁদের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দিনের বেলায় তাঁদের ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে বের করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশি সহায়তায় ঘরে ফিরতে পারলেও বেড়া সরানো হয়নি।
জমি মালিকানা নিয়ে বিরোধের পেছনের ইতিহাস বেশ জটিল। স্থানীয় সূত্র ও দলিলপত্র অনুসারে, কর্মকারপাড়ার বাসিন্দা মন্টু কর্মকার ২০০৩ সালে তাঁর চাচাতো ভাই উত্তম রায়ের কাছ থেকে ১৮৯৭ দাগের ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমি বায়নামূলে কেনেন। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর দলিল লেখক ও সাবেক ইউপি সদস্য আশিকুর রহমানের মাধ্যমে বিক্রয় দলিল সম্পন্ন হয়, যেখানে উত্তম রায় স্বাক্ষর করেন। মন্টুর দাবি, তিনি জমির মূল্য বাবদ ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দলিল জমা দেওয়ার আগেই উত্তম চলে যাওয়ায় সেটি নিবন্ধিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে উত্তম একই জমি সৌদি আরবপ্রবাসী রফিক মিয়ার কাছে বিক্রি করেন। বিষয়টি জানার পর মন্টু গত এক বছরের মধ্যে দুই দফায় আদালতে মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকেই উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয় বাসিন্দা তাউস মিয়া জানিয়েছেন, প্রথমে মন্টুই ওই জায়গা কিনেছেন এবং পরে উত্তম একই স্থান রফিকের কাছে বিক্রি করেছেন। আরেক বাসিন্দা সুজন পাঠান বলেন, একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও কোনো পক্ষই ছাড় না দেওয়ায় সমস্যা সমাধান হয়নি। মন্টুর পরিবারের সদস্য সুবর্ণা কর্মকার জানান, দিনের বেলায় শৌচাগার ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে রাতে পাশের পুকুরপাড়ে যেতে হচ্ছে। পানির জন্য প্রতিদিন কলস নিয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যেতে হচ্ছে।
মন্টু কর্মকার প্রথম আলোকে বলেন, দলিলে উত্তম স্বাক্ষর করলেও নিবন্ধন হয়নি। অনিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতেই তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এখন রফিক মিয়ার লোকজন বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েছে এবং মামলা বা বাড়াবাড়ি করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রফিক মিয়ার স্ত্রী জানাহারা বেগম। তাঁর মতে, তাঁরা নিজেদের জায়গায়ই বেড়া দিয়েছেন। মন্টুর জায়গায় বেড়া দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। হামলা-মামলা করলে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। জমির আগের মালিক উত্তম রায় আবার দাবি করেছেন, মন্টু জালিয়াতি করে তাঁর কাছ থেকে দলিলে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি জমি রফিকের কাছে বিক্রি করেছেন। মন্টুর সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক মিয়া প্রথম আলোকে জানান, উত্তমের কাছ থেকে মন্টু জায়গা কিনেছেন বলে তিনি শুনেছেন। মন্টুর কাছে দলিল বা বায়নাপত্রও রয়েছে। পরে একই জায়গা রফিক কিনেছেন বলেও তাঁর জানা আছে। উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করবেন বলে তিনি জানান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও হরিপুর ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, উত্তমের কাছ থেকে জায়গা কেনা হলেও দলিলটি নিবন্ধন হয়নি। মন্টুর লিখিত অভিযোগের পর পুলিশ বাড়িতে গিয়ে বাঁশ ও টিনের বেড়ার কিছু অংশ সরিয়ে দিয়েছে। উভয় পক্ষকে থানায় বসে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও কেউ আসেননি। ফলে পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে এবং পরিবারটি অবরুদ্ধ অবস্থায়ই দিন কাটাচ্ছেন।




