গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে তুরস্ক থেকে একটি ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান মোহাম্মদ ফরিদ। শৈশব থেকেই বিদেশে থাকার কারণে তিনি ঠিকমতো নিজের পরিচয় উপস্থাপন করতে পারছিলেন না। কেবল নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ঠিকানা হিসেবে ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এইটুকুই জানাতে সক্ষম হন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটি বা এভসেক (AVSEC) বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন।
এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান। গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ছোট ভাই সৈয়দ আলমের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া হলে ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ফরিদের একটি হাতে পাঁচটির বদলে ছয়টি আঙুল রয়েছে; সেই বাড়তি আঙুল দেখেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন।
ফরিদের বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায়। গত বৃহস্পতিবার তিনি দেশে ফেরেন। পরবর্তীতে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় পরিবারের খোঁজ পাওয়ার পর তাঁকে ঢাকায় ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কাছে তুলে দেওয়া হয়। সৈয়দ আলম উখিয়ার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। পরে ফরিদকে কক্সবাজারে থাকা তাঁর বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগমের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ছোট ভাই সৈয়দ আলম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারটি ধরে নিয়েছিল ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাঁকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১০ বছর বয়সে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাবার সঙ্গে ভারত হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। সেখানে জীবিকার সন্ধানে বাবা-ছেলে ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যেই পাকিস্তানে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারাতে হয় ফরিদকে। চিকিৎসকেরা তাঁর দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এরপর মানব পাচারকারীদের একটি চক্র উন্নত জীবনযাপন ও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাঁকে তুরস্কে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাঁদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা গেছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। এদিকে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, শুধু পরিবারের কাছে ফেরানোই নয়; ফরিদ যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কিছু করতে চান তাঁরা।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম জানিয়েছেন, মোহাম্মদ ফরিদকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। অন্যদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।




