খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার আমতলা নদীর আশপাশের বাসিন্দারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে নদীতে ইজারাদারদের স্থাপন করা নেটপাটায় পানি আটকে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা একত্রিত হয়ে সেই নেটপাটা অপসারণ করেন। এরপর থেকেই তাঁরা আবার নদীতে মাছ ধরতে ও পানি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ রয়ে গেছে—ইজারাদাররা আবার ফিরে আসবেন কিনা।
আমতলা নদীর বর্তমান সংকটের শুরু ২০২৩ সালে। সে বছর খুলনা জেলা প্রশাসন এই নদীকে ৬০ একর আয়তনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ হিসেবে চিহ্নিত করে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বার্ষিক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ছয় বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেয়। ইজারাদার হিসেবে নাম রয়েছে সুধীর সরদারের। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর পেছনে ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হারুনুর রশিদ, যিনি বর্তমানে পলাতক। ইজারা কার্যকর হওয়ার পর নদীর বিভিন্ন স্থানে আড়াআড়িভাবে বাঁশের পাটা বসানো হয়। এতে আমতলা নদীর দুই প্রান্তের স্লুইসগেট এবং মাঝামাঝি খেজুরতলা গেট দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এই নদী ও তার সংযুক্ত খালগুলো—খড়িয়া, বটবুনিয়া, বরাখালী, ছোটখড়িয়া, মরাখড়িয়া, গোন্ধামারী ও বটিয়াঘাটা খাল—পুরো এলাকার কৃষি, পানি নিষ্কাশন ও মৎস্য সম্পদের প্রাণরেখা হিসেবে কাজ করে। উপজেলার অন্তত ৩৭টি গ্রামের প্রায় ৪৫ হাজার একর কৃষিজমির পানিনিষ্কাশন এই নদীর মাধ্যমেই হয়। কৃষকেরা আমন, আউশ, বোরো ধান, তরমুজ, কুমড়া, তিল, মুগ ডালসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেন এ নদীর পানি ব্যবহার করে। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জন্যও এটি প্রধান অবলম্বন। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
১৯৮৫ সাল থেকে আমতলা নদী জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হয়। এর আগে এটি উন্মুক্ত ছিল এবং স্থানীয় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে ব্যবহার করতে পারতেন। ইজারা চালু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের নদীতে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, ইজারাদাররা লবণপানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষের সুযোগ তৈরি করেন, যা কৃষিজমি ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০০৬ সালে স্থানীয়রা তৎকালীন ভূমিমন্ত্রীর কাছে এবং ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসকের কাছে আমতলা নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর ইজারা বাতিলের দাবি জানান। উপজেলা প্রশাসন তখন একাধিক তদন্ত চালিয়ে বিভিন্ন স্থানের অবৈধ নেটপাটা ও বাঁধ অপসারণ করে।
এ অবস্থায় আবারও ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন আদালতের শরণাপন্ন হন। ২০১০ সালে আদালতের আদেশে ইজারা-সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত হয়। দীর্ঘ ১২ বছর উন্মুক্ত থাকার পর ২০২২ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন আবারও ইজারা দেয়। বর্তমানে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ৯০ বছর বয়সী কায়েম আলী বিশ্বাস জানান, তিনি ভয়ে মাছ ধরেন—শুনেছেন নদী ‘বিক্রি করে দিয়েছে’। অন্যদিকে গঙ্গারামপুরের উত্তম সেন বলেন, এই নদী থেকেই তাঁর সংসার চলে, কিন্তু ইজারার কারণে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এ বিষয়ে খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ১৩ জুলাই আমতলা নদী পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি তদন্ত করে ইজারা বাতিলের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রথম আলো বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। জেলা প্রশাসনের নথিপত্রে আমতলা নদীকে ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখানো হয়েছে, যা নদীর প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ।
নদী-গবেষক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ জানান, নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ নষ্ট করাই ইজারা দেওয়ার কৌশল। তিনি বলেন, যাঁরা নদী ইজারা দেন, তাঁরা সচেতনভাবে আইন লঙ্ঘন করেন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এই প্রথা বন্ধ হবে না। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারা ও ২০১৯ সালের হাইকোর্টের রায় নদীকে জীবন্ত সত্তা স্বীকৃতি দিলেও সব আইন অমান্য করে ইজারা বহাল রাখা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।




