প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একদল ভূতাত্ত্বিক গবেষক পৃথিবীর অভ্যন্তরের রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে একটি অসাধারণ দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছিলেন। উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপে ১৯৭০ সালে শুরু হয় এই খননকাজ। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই অভিযানের সমাপ্তি ঘটে ১৯৮৯ সালে। ততদিনে গর্তটির গভীরতা পৌঁছে যায় ১২ হাজার ২৬২ মিটার বা প্রায় ১২ দশমিক ২ কিলোমিটারে। মানুষের তৈরি স্থাপনার মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গভীর উল্লম্ব গর্ত।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণা। খনিজ তেল বা মূল্যবান ধাতুর সন্ধান এখানে প্রাসঙ্গিক ছিল না। ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তর সম্পর্কে যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, প্রত্যক্ষ শিলা নমুনা সংগ্রহ করে তার সত্যতা যাচাই করাই ছিল মুখ্য লক্ষ্য। প্রথমে ১৫ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
খননকালে পৃথিবীর ভূত্বকের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে হয়। প্রায় ৬ হাজার ৮৪২ মিটার পর্যন্ত আগ্নেয় ও পাললিক শিলা অতিক্রমের পর বিজ্ঞানীদের সামনে ধরা দেয় শতকোটি বছরের পুরোনো নাইস শিলা। ধারণা করা হতো গ্রানাইটসমৃদ্ধ এই স্তরের নিচে কঠিন ব্যাসাল্টের একটি স্পষ্ট স্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন কেলাসিত শিলার জটিল নেটওয়ার্ক। সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার ছিল প্রায় ১১ কিলোমিটার গভীরে শিলার সূক্ষ্ম ফাটলে তরল পানির উপস্থিতি।
খনন যখন ১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে পৌঁছায়, তখন বিজ্ঞানীরা গুরুতর কারিগরি ও প্রাকৃতিক বাধার সম্মুখীন হন। ধারণার চেয়ে মাটির গভীরে তাপমাত্রা অনেক বেশি ছিল—প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই প্রচণ্ড তাপে ড্রিলিং যন্ত্রাংশ নরম হতে শুরু করে এবং কাজ করার অযোগ্য হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভূগর্ভের অতিরিক্ত চাপে গর্তের দেয়াল বারবার দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে এবং সংকুচিত হতে থাকে। এই প্রযুক্তিগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে প্রকল্পটির অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে গর্তটিকে স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধ যেখানে প্রায় ৬ হাজার ৩৭১ কিলোমিটার, সেখানে এই গর্তটি তার মাত্র শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ গভীর। ফলে ভূত্বকের নিচে অবস্থিত হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত ম্যান্টল স্তর পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ পাঁচ দশক অতিক্রম করলেও আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণা প্রকল্প এত গভীরে সরাসরি গর্ত তৈরি করতে পারেনি।




