যুক্তরাজ্যের অ্যাংলেসির ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা ভিক্টোরিয়া স্টেলাসের জীবনে ২০১৯ সালের গ্রিস ভ্রমণ এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। ছুটিতে সিরোস দ্বীপে স্বামীর ভাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দেশে ফিরেই শুরু হয় রাতে খিঁচুনি। প্রথম দফায় হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসকেরা তাঁর অসুস্থতার সঠিক কারণ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীকালে এমআরআই পরীক্ষার পর তাকে জরুরি ভিত্তিতে লিভারপুলের ওয়ালটন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ ৪২ দিন তাকে কৃত্রিমভাবে কোমায় রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে, ভিক্টোরিয়া এঁটুলি পোকা বা টিকবাহিত এনসেফালাইটিস (টিবিই) নামক এক ভাইরাসজনিত মস্তিষ্কের প্রদাহজনক সংক্রমণে ভুগছিলেন। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস) অনুযায়ী, এই ভাইরাসটি ইউরোপ, রাশিয়া, চীন ও জাপানের কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং এঁটুলি পোকার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।

ভিক্টোরিয়ার ধারণা, যেবাড়িতে তারাও ছিলেন সেখানে ছাগল থাকায়, আর ছাগলের গায়ে প্রায়শই এঁটুলি পোকা থাকে, সেই সূত্রেই তিনি কামড় খেয়ে থাকবেন। এক সন্তানের এই মা জানান, এই ঘটনা তার পুরো জীবনই বদলে দিয়েছে। "আগে আমি খুব প্রাণবন্ত ছিলাম, কিন্তু এখন অনেক সময় চুপচাপ থাকি। কাজ ছাড়া তেমন একটা বাইরেও যাই না," বলেন তিনি। অসুস্থতার আগে একটি পাব এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একটি স্কুলে শিক্ষকের সহকারী হিসেবে দুই চাকরি করতেন ভিক্টোরিয়া। কিন্তু সংক্রমণ ও পরবর্তী জটিলতার জেরে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার কারণে তাকে দুই চাকরিই হারাতে হয়। তিনি বলেন, “আমাকে এমন কোনো কাজের কথা বলুন যেখানে স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন হয় না। বাজার করা, ভ্রমণ করা, সবকিছুতেই স্মৃতি লাগে। যখন পুনরায় শিক্ষক সহকারী হিসেবে যোগ দিতে যাই, তখন ক্লাসের বাচ্চাদের আর সহকর্মীদের নাম মনে রাখতে পারতাম না। সবাইকে চিনতে পারলেও নাম মনে আসত না। এই সমস্যাটা এখনো রয়ে গেছে।”

বর্তমানে দিনে ১৮ ধরনের ওষুধ খেতে হয় তাকে, যদিও এখন রাতে আগের মতো ঘন ঘন খিঁচুনি হয় না। তিনি এখন মায়ের সঙ্গে এক ঘরে ঘুমান। পাঁচ বছর বয়সে গ্রিস থেকে ওয়েলসে আসা ভিক্টোরিয়া জানান, প্রতিবছর ছুটি কাটাতে গেলেও এঁটুলিবাহিত এনসেফালাইটিসের টিকার বিষয়ে তার আগে কোনো ধারণাই ছিল না। এখন তার কামনা, যারা টিবিই-র জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বনাঞ্চল বা পশুপাখির কাছাকাছি ভ্রমণ করবেন, তারা যেন অবশ্যই টিকা নেন। দৈনন্দিন কাজ মনে রাখার জন্য এখন তাকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তার মা লিজ স্টেলাস বলেন, “যেসব জিনিস দেখতে নিরীহ লাগে, সেগুলো বাস্তবে ততটা নিরীহ নয়। একটি পোকার কামড় আপনার জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।”

লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেনেডিক্ট মাইকেল প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ানো সংক্রামক রোগের গবেষক। তিনি জানান, গত তিন দশকে বিশ্বজুড়ে টিবিই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও যুক্তরাজ্যে এটি এখনও বিরল। তাঁর মতে, গুরুতর সংক্রমণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল, কারণ আক্রান্তের মাত্র ৩ শতাংশের মস্তিষ্কে জটিলতা দেখা দেয়। বাকি ৯৭ শতাংশেরই হয় কোনো উপসর্গ থাকে না, অথবা কিছুদিনের জন্য ফ্লুর মত লক্ষণ দেখা দেয়। এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই বলে জানান মাইকেল। এজন্য টিকা গ্রহণে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এনএইচএসও ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণকারীদের জন্য অন্তত এক মাস আগে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।