ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার অজুহাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাম্প্রতিক কিছু তৎপরতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা প্রণয়ন করে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এবং ইতোমধ্যে সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
শিক্ষকদের এই সংগঠনটির মতে, কোনোরূপ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হচ্ছে, যা ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন। বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক মত প্রকাশ বা সমর্থন কোনো অপরাধ নয়। কেবল ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় সহকর্মীদের প্রতি এহেন প্রতিশোধমূলক আচরণ আমাদের কেবল ক্ষমতার দর্পে অন্ধ হওয়া আওয়ামী ফ্যাসীবাদী শিক্ষকদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে নেটওয়ার্ক। তারা স্বীকার করে, এক শ্রেণির শিক্ষক দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যাঁরা শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা প্ররোচিত করা, হলের নিপীড়নে প্রশ্রয় প্রদান, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের অথবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনে বাধা দেওয়ার সাথে জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম চেতনা। কিন্তু তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে আইনি কাঠামো ও ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়েই, প্রতিহিংসা বা কোনো মতাদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে নয়।
নেটওয়ার্কটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেছে, কেবলমাত্র কোনো ব্যক্তি একটি মত ধারণ বা সমর্থন করার দায়ে শাস্তি পেতে পারেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি সেই মতকে সহিংস বা ক্ষতিকর কোনো কাজে পরিণত করার জন্য সুস্পষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। একটি অগ্রহণযোগ্য মতামত কারও প্রতি সম্মান ক্ষুন্ন করলেও, তা কারও জীবিকা কেড়ে নেওয়ার বৈধ যুক্তি হতে পারে না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢালাওভাবে তালিকা তৈরি করা, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করে সামাজিক হয়রানি চালানো, অথবা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ের সব নিয়োগের বিরুদ্ধে অব্যাহত তদন্তের ঘোষণা দেয়া এক ধরনের ‘ডাইনি-খোঁজা’ (উইচ-হান্টিং) সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
এ ধরণের তৎপরতা নতুন করে ভয় ও আতঙ্কের আবহাওয়া তৈরী করছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, যা সেই ক্ষমতাবর্ধী আচরণের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন দাঁড়িয়েছিল। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধিনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
দাবিগুলো হলো: যে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ থাকতে হবে; প্রতিটি অভিযোগের স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে; অভিযুক্ত প্রত্যেককে অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে; সিদ্ধান্ত হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে ও ১৯৭৩ সালের অর্ডারে বর্ণিত ধাপিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে; এবং শুধুমাত্র রাজনৈতিক মত, পরিচিতি বা তালিকার ভিত্তিতে নেওয়া সব ঢালাও ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে প্রত্যাহার করতে হবে।




