বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের বোঝা হালকা করতে নতুন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 'সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬' নামে পরিচিত এই আইনের খসড়া ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত চেয়ে প্রকাশিত খসড়ায় ব্যাংকের অপরিশোধিত ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, এই আইন নিয়ে তারা ব্যাপক মতামত আশা করছেন। তার মতে, সাধারণত প্রস্তাবিত আইনের বিপরীতে খুব বেশি মতামত আসে না, তবে ডামা আইন সম্পর্কে তারা আশাবাদী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের 'আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫' অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ অচল ঋণ ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আদালতে মামলা, সম্পদ বিক্রির দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা ও দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে বছরের পর বছর এসব অর্থ আটকে থাকছে।

নতুন আইনের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে 'সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট' গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ইউনিটের লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করবে 'সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি'। পাশাপাশি থাকবে 'ঋণ সেবাদাতা কোম্পানি', যারা ঋণ আদায় ও পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলো নিজেরা খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে বা অর্থঋণ আদালতের ওপর নির্ভর করে। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক চাইলে তাদের খেলাপি ঋণ বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে। সেই কোম্পানি ঋণ আদায়, পুনর্গঠন, জামানত ব্যবস্থাপনা, এমনকি প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রির দায়িত্ব নেবে। অর্থাৎ, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষায়িত বাজার তৈরির পথ উন্মুক্ত করা হচ্ছে।

খসড়া আইনে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটকে একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা হিসেবে গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকবে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ইউনিটটি সম্পদ অধিগ্রহণ, তদারকি, লাইসেন্স প্রদান, নির্দেশনা জারি, জরিমানা আরোপ এবং প্রয়োজন হলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা পাবে। সংকটাপন্ন সম্পদ এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্স গঠনেরও বিধান রাখা হয়েছে। শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবেই নয়, খেলাপি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার পরিচালনার দায়িত্বও থাকবে ইউনিটের ওপর।

সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য কঠোর শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে, নির্ধারিত মূলধন থাকতে হবে এবং পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন বা সম্পদ পুনরুদ্ধারে অভিজ্ঞ হতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এই কোম্পানিগুলো শুধু খেলাপি ঋণ কিনবে না, বরং ঋণ পুনর্গঠন, ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পুনর্বিন্যাস, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর, ব্যবসার পুরো বা আংশিক অংশ বিক্রি কিংবা ইজারা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে পারবে। অর্থাৎ, শুধু জামানত বিক্রি করে নয়, বরং ব্যবসা সচল রেখে ঋণ আদায়ের পথও রাখা হয়েছে।

ঋণ সেবাদাতা কোম্পানিগুলো ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা, পুনঃতফসিল, সমঝোতা, সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, মূল্যায়ন, সম্পদ অনুসন্ধান এবং আদালতের মামলায় সহায়তা দেবে। তবে তারা নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে না, জনগণের কাছ থেকে আমানত নিতে পারবে না এবং কোনো ধরনের জোরপূর্বক বা বেআইনি ঋণ আদায় করতে পারবে না।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রস্তাবিত আইনটি বাজারভিত্তিক করতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এএমসিগুলো যেন বাজারভিত্তিক মূল্যে সংকটাপন্ন ঋণ নিয়ে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার করতে পারে, সেরকম ব্যবসায়িক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। মন্দ ঋণের লেনদেনে বিদ্যমান আইনি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর করতে হবে এবং জামানতের অধিকার নির্বিঘ্নে স্থানান্তরের সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, অতীতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি থাকলেও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে সেগুলো ভালো কাজ করতে পারেনি। তিনি নতুন আইনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে এবার পূর্বের দুর্বলতাগুলো দূর হবে।

খসড়া আইনে সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন খেলাপি ঋণ একত্র করে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, যৌথ উদ্যোগ বা বিভিন্ন বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমেও মূলধন সংগ্রহ করা যাবে। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়নি।

নতুন আইনে কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির বিধান রাখা হয়েছে। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট যেকোনো সময় কোম্পানির কাছ থেকে তথ্য, নথি ও হিসাব চাইতে পারবে এবং প্রয়োজনে নিরীক্ষা ও তদন্ত চালাতে পারবে। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে জরিমানা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলের বিধানও রয়েছে। তবে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণের জন্য একটি বিশেষায়িত বাজার গড়ে উঠতে পারে। এতে ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে দীর্ঘদিনের অচল ঋণ সরিয়ে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানও এই খাতে আগ্রহী হতে পারে।