কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় সবুজায়নের ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন চিকিৎসক এ এস এম মুসা কবির। তাঁর উদ্যোগে গত তিন বছরে ১১ হাজার ৬৯৯টি চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের এই চিকিৎসকের বাড়ি দৌলতপুরের দাড়েরপাড়া গ্রামে। শহরে থাকলেও প্রতি মঙ্গলবার তিনি গ্রামে গিয়ে গাছের খোঁজখবর নেন।

এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য স্থানীয় তরুণদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে 'স্মাইল ফর অল' নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি আকাশ বিশ্বাস জানান, রোপণের পর প্রতিটি গাছের নিয়মিত তদারকি করা হয়। গবাদিপশুর হাত থেকে রক্ষা করতে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পাইপ ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। প্রয়োজনে কীটনাশক স্প্রে এবং গরমের সময় পানি দেওয়ার কাজও করেন তারা।

২০২৩ সালের ১ জুলাই নিজের অর্থায়নে এই কাজ শুরু করেন মুসা কবির। পরিবেশ বিপর্যয় রোধ এবং ফলের গাছ বাড়িয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর ভাবনা থেকেই তাঁর পথচলা। তাঁর মতে, ফলদ গাছ মানুষ, পশুপাখি ও পরিবেশ—তিন ক্ষেত্রেই উপকার বয়ে আনে। মানুষ ফল পায়, পাখি খাদ্য পায়, আর পরিবেশ থাকে সবুজ। পাশাপাশি ফলদ গাছ কেউ সহজে কাটতে চায় না বলেও জানান তিনি। কারণ, এই গাছ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও খাদ্যগত মূল্য তৈরি করে। তাই ফলদ গাছের পাশাপাশি বনজ ও ঔষধি গাছও লাগানো হচ্ছে।

উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কৈপাল-হিসনাপাড়া সড়কে ২০২৪ সালে রোপণ করা ১০০টি আম্রপালি আমগাছের মধ্যে প্রায় ৩০টি গাছে এবার ফল ধরেছে। স্থানীয় বাসিন্দা হারুনোর রশিদ জানান, তাঁর বাড়ির সামনের গাছ থেকে এবার ১৭টি আম তিনি পেয়েছেন। রাস্তার পাশে গাছে ফল দেখে আশপাশের অনেক পরিবার এখন নিজেরাই ফলদ গাছ লাগানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে। হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের জয়রামপুর-বেগুনবাড়ি সড়কে রোপণ করা প্রায় ৭০০টি সুপারিগাছও বেড়ে উঠছে। একই সড়কে লাগানো ১৫টি আমগাছের মধ্যে ১৪টিই জীবিত রয়েছে।

২০২৩ সালে শশীধরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তারাগুনিয়া-শশীধরপুর সড়কে 'স্মাইল ফর অল' থেকে পাওয়া আমগাছ রোপণ করেছিলেন। এবার বেশির ভাগ গাছে দ্বিতীয়বারের মতো মুকুল এসেছে। পথচারী আল আকসার জানান, গাছগুলো এখন বেশ বড় হয়ে গেছে এবং তিনি নিজেই রাস্তার পাশের গাছ থেকে এবার আটটি আম খেয়েছেন।

চারা বিতরণের জন্য আল্লারদর্গা এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে 'প্ল্যান্ট হাব'। সেখানে বিভিন্ন নার্সারি থেকে নানা জাতের গাছের চারা এনে রাখা হয়। প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে আবেদনপত্র নেওয়ার পর সেই চাহিদা অনুযায়ী গাছ বিতরণ করা হয়। এই হাবে কাঠগোলাপ, জবা, আম, আমড়া, কাঠবাদাম, চালতা, লাল পেয়ারা, থাই পেয়ারা, নিম, কতবেল ও কামরাঙা গাছ রয়েছে। চলতি বছর এই হাব থেকে প্রায় ৩ হাজার চারা বিতরণ করা হয়েছে। সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৩৯৯টি গাছ রোপণ এবং ৭ হাজার ৩০০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।

নাসির উদ্দিন বিশ্বাস বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ লিয়াকত আলী বলেন, গাছ রোপণের পর যেভাবে পরিচর্যা করা হচ্ছে, তাতে একটি গাছও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সার, পানি দেওয়াসহ সব পরিচর্যা করায় বিষয়টি এলাকায় সাড়া ফেলেছে।

সবুজায়নের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ চালু করেছেন মুসা কবির। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রিফায়েতপুর ইউনিয়নের হরিণগাছি মোল্লাপাড়ায় ১৭ জন নারী শিক্ষার্থী নিয়ে প্রথম ব্যাচের যাত্রা শুরু হয়। দুই দশকের বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রশিক্ষক আরিফা আবেদিন এই প্রশিক্ষণ দেন। এ পর্যন্ত ৮টি ব্যাচে প্রায় ২০০ নারী বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রতিটি ব্যাচের সেরা একজন প্রশিক্ষণার্থীকে একটি করে সেলাই মেশিন এবং অংশগ্রহণকারীদের সেলাই উপকরণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হলে যাতে পরামর্শ নেওয়া যায়, সেজন্য একটি ফ্রি হেল্পলাইনও চালু রয়েছে।

ফিলিপনগর ইউনিয়নের চর সাধীপুরের গৃহবধূ রুনা বেগম বলেন, বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। এতে তাঁর মতো আরও নারীরা উপকৃত হচ্ছেন।

মুসা কবির প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে। ফলের গাছ বাড়লে মানুষের পুষ্টির চাহিদা মিটবে। এই ভাবনা থেকেই তাঁর উদ্যোগ। সব ধরনের মানুষ তাকে সহযোগিতা করছেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি গাছ লাগানোর ইচ্ছা রয়েছে তাঁর, লক্ষ্য এক লাখ গাছ রোপণ।