সাভারে সাম্প্রতিক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের জন্য অপ্রচলিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, তারা যোগাযোগে ‘প্রটেকটেড টেক্স’ (পিটি) নামে একটি ওয়েবসাইট এবং টাকা লেনদেনে ‘ইলিমেন্ট’ নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করতেন।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে পাঁচটি জিআই পাইপে তৈরি বোমা ও ছুরিসদৃশ তিনটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে আরিফের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি পাইপবোমা (আইইডি) এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাভার থানায় আরিফসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি সূত্র জানিয়েছে, আরিফসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সাথে জড়িতদের চলাফেরার ধরনে মিল রয়েছে। তারা সাধারণত পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলাচল করে, যার ভেতরে বোমা, অস্ত্র, ছুরি ও চাপাতি রাখা হয়। তল্লাশির মুখে পড়লে তারা এসব অস্ত্র দিয়ে তাৎক্ষণিক হামলা চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে।
আরিফকে গ্রেপ্তারের পরদিন সাভারের সাধাপুর এলাকায় একটি মসজিদের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামে স্কচ টেপে মোড়ানো একটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা থেকে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। পরপর দুই দিনে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সাভার থানায় মামলা করে পুলিশ। সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ছয় দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। মামলাটি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আসামিসহ মামলার নথিও সেই ইউনিটের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বোমাগুলোর মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে। মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং আশুলিয়ার একটি মুদিদোকান থেকে উদ্ধার করা প্রেশার কুকার বোমা তৈরিতে একই ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য, বিয়ারিং বল ও সার্কিট সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বোমায় ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপার–অক্সাইড (টিএটিপি) নামে বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাপ, ঘর্ষণ, আঘাত বা নড়াচড়ায় বিস্ফোরিত হতে পারে। একাধিক ঘটনায় একই ধরনের উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাদের ধারণা, এসব ঘটনার মধ্যে সাংগঠনিক যোগসূত্র থাকতে পারে।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই ঘটনায় রাকিব নামে এক যুবক এক পুলিশ সদস্যকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও প্রায় ১০টি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতে নব্য জেএমবির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে বলে সিটিটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় একই পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তারা হলেন মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুন, শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফ, রাকিব ও বাপ্পী। তদন্তকারীরা বলছেন, পলাতক মামুন নব্য জেএমবির এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাপ্পীও পলাতক, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।




