আজীবন সম্মাননা প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাইলে কিংবদন্তি এই শিল্পী বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া তার জন্য অত্যন্ত গৌরবের। ছোটবেলায় স্কুলের ছোট পুরস্কারেও যেমন আনন্দ পেতেন, এই বয়সে এসে এত বড় সম্মান পাওয়ায় তিনি অভিভূত। তিনি মনে করেন, দেশের মানুষ এত বছর পরও তাকে ভালোবেসে চলেছেন—এটিই একজন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। বিমানবন্দরে কিংবা রাস্তাঘাটে অনেকে এখনো তাকে 'রূপনগরের রাজকন্যা' গানের কথা মনে করিয়ে দেন, যা তাকে আবেগাপ্লুত করে।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শবনম জানান, পুরান ঢাকার নবাবপুরে তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন দারুণ টমবয় ধরনের। কাজিনদের সঙ্গে মার্বেল, ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেট—সব খেলাই তিনি খেলতেন। ফুটবল ছাড়া সব খেলায় তার উৎসাহ ছিল। মার্বেল খেলার জন্য তার ফ্রকের পকেট সব সময় ভরা থাকত। ১৯৪৬ সালে ঢাকার নবাবপুরের মদনমোহন বসাক লেনে তার জন্ম। বাবা ননী বসাক ছিলেন গ্র্যাজুয়েট স্কুলের শিক্ষক ও ফুটবল রেফারি, আর মা উষা বসাক ছিলেন গৃহিণী। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছোট, বড় বোন সন্ধ্যা বসাক থাকেন কলকাতায়।

অভিনয়ে আসার গল্প বলতে গিয়ে শবনম জানান, বড় বোনের নাচ দেখে দেখেই তিনি নাচ শেখা শুরু করেন। বাবা তার এই আগ্রহ দেখে তাকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। সেখানেই চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তার বাবার বন্ধু ছিলেন এবং একটি ছবির কোরাস গানে অভিনয়ের সুযোগ পান। প্রথমে মা এতে রাজি ছিলেন না, কিন্তু বাবার প্রবল আগ্রহে তিনি কাজটি করেন। তার জীবনের প্রথম সিনেমা 'এ দেশ তোমার আমার'। পরে 'রাজধানীর বুকে' ছবিতে একটি গানের দৃশ্যে অভিনয় করে পরিচালক মুস্তাফিজের নজরে আসেন এবং তিনিই তাকে 'হারানো দিন' ছবিতে নায়িকা হিসেবে নির্বাচন করেন।

নিজের অভিনয়জীবন প্রসঙ্গে শবনম বলেন, নায়িকাদের যে বিশেষ অহংকার বা নখরামি থাকে, তা তিনি কখনোই শিখতে পারেননি। এই বিনয়ই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। পাকিস্তানে ৩০ বছর কাজ করেও তিনি কোনোদিন কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি—এটা তার কাছে বড় পাওয়া।

সংগীত পরিচালক রবিন ঘোষের সঙ্গে পরিচয় ও প্রেমের গল্পও শেয়ার করেছেন তিনি। 'হারানো দিন' ছবির কাজের সূত্রে তাদের পরিচয়, তবে লাহোরে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচে যাওয়ার সময় হোটেলে একা পেয়ে রবিন ঘোষ প্রেমের প্রস্তাব দেন। পাঁচ বছর প্রেমের পর 'তালাশ' ছবির সময় তাদের বিয়ে হয়। বাবা প্রথমে এই বিয়েতে রাজি না হলেও মা সমর্থন জানান। রবিন ঘোষের গাইডেন্সেই তিনি শবনম হতে পেরেছেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানে ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে শবনম জানান, সাংবাদিক ইলিয়াস রশিদীর পরামর্শে তারা পাকিস্তানে যান। প্রথমে করাচিতে গিয়ে ওয়াহিদ মুরাদের সঙ্গে 'সামান্দার' ছবিতে কাজ করেন। পরে লাহোরে গিয়ে 'নাজ' ও 'দোস্তি' ছবিতে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। দিনে চারটি ছবির শুটিংও করেছেন তিনি, সময় ভাগ করে নেওয়ার কৌশল শিখেছিলেন নায়ক মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে। লাহোরে তার অভিনীত 'দোস্তি' ছবিটি ছিল সুপারহিট।

পাকিস্তানে নাদিমের সঙ্গে তার জুটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। ৫০টির বেশি ছবিতে তাদের একসঙ্গে অভিনয়। নাদিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। নাদিম শুটিংয়ে দেরি করলেও কাজ শেষ না করে বের হতেন না, যা তিনি পছন্দ করতেন। পর্দায় তাদের এত ভালো রসায়ন ছিল যে দর্শকরা তাদের স্বামী-স্ত্রী ভাবতেন। এমনকি নাদিমকে জিজ্ঞেস করা হতো কেন তিনি শবনমকে বিয়ে করেননি।

পাকিস্তানে ১৫০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন শবনম। তার অভিনীত 'আন্ধেলি', 'দোস্তি', 'বন্দেগি', 'আয়না', 'বন্দিশ'সহ বেশ কয়েকটি ছবি সুপারহিট। তার অভিনীত তিনটি ছবি ভারতে রিমেক হয়েছে। ১৯৯৯ সালে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।