ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে গত ৩ মার্চ নাসির আলী মামুনের ফটোজিয়াম ‘লাইফ অব পোয়েট্রি’ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মতিউর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোকচিত্রী মামুনের এই আয়োজনটি দুই কিংবদন্তি কবিকে নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে গত বছরের ২২ আগস্ট বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘শতবর্ষে সুলতান’ শিরোনামে এস এম সুলতানের ওপর একটি প্রদর্শনী করেছিলেন মামুন। শিল্পী সুলতান ঢাকার আধুনিক শিল্পী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। তার প্রতি তখন সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণও জন্মায়নি। অনুরূপভাবে শামসুর রাহমানের সঙ্গে নৈকট্য থাকলেও আল মাহমুদকে কিছুটা দূরেই সরিয়ে রাখা হয়েছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের রাজনৈতিক বিভেদের ফলেই এ দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে মত দেন বক্তা।
১৯২৯ সালে ঢাকার ৩৬ মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। অন্যদিকে ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্ম আল মাহমুদের। বয়সের ব্যবধান ৭ বছর। শামসুর রাহমান ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন, আর আল মাহমুদের আয়ু ছিল ৮৩ বছর। শিক্ষাজীবনে শামসুর রাহমান পোগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অন্যদিকে আল মাহমুদের পড়াশোনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও সীতাকুণ্ডে; তবে নবম বা দশম শ্রেণির বেশি তিনি পড়তে পারেননি। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা আল মাহমুদ শস্যখেত, পুকুর, বৃষ্টিভেজা গ্রাম আর পুরোনো মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিপরীতে শামসুর রাহমান বেড়ে ওঠেন ঢাকা শহরের কোলাহলের মধ্যে।
সাংবাদিকতা জীবনে শামসুর রাহমান মর্নিং নিউজের সিনিয়র সাবএডিটর, রেডিও পাকিস্তানে কর্মরত থেকে দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক, সম্পাদক এবং প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আল মাহমুদ কাফেলা পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে মিল্লাত ও ইত্তেফাকে প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ করেন। ইত্তেফাকের গ্রামবাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও তিনি নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের একটি ইশতেহারে ছাপা হয় আল মাহমুদের প্রথম কবিতা। শামসুর রাহমান ৬০টি কবিতার বইসহ শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। আল মাহমুদ লিখেছেন ৫০টি কবিতার বইসহ আশির বেশি বই।
ছাত্রজীবনে আল মাহমুদ বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। শামসুর রাহমান যুক্ত ছিলেন গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধে আল মাহমুদ সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং দেশের ভেতরে ও কলকাতায় অবস্থান করেন। শামসুর রাহমান তখন ঢাকায় থেকেই স্বাধীনতার পক্ষে কবিতা লেখেন। দুই কবিই ঢাকা ও কলকাতার পাঠক সমাজে স্বীকৃত ছিলেন। তবে ধীরে ধীরে কলকাতায় শামসুর রাহমান জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও আল মাহমুদ কিছুটা পিছিয়ে পড়েন।
সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজে মতিউর রহমান ১৯৬৮ সালে শামসুর রাহমানের কাছ থেকে কবিতা সংগ্রহ করেন। ১৯৬৯ সালে ইত্তেফাক অফিসে আল মাহমুদের সঙ্গেও তার দেখা হয়। স্বাধীনতার পর শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার সম্পাদক হন। আল মাহমুদ রাজনৈতিক কারণে গণকণ্ঠের সম্পাদক হন। ১৯৭৪ সালে জাসদ কর্মীদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তার হন। জেলে গিয়ে শামসুর রাহমান তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে বঙ্গবন্ধু তাকে মুক্তি দিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি দেন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।
বক্তব্যে মতিউর রহমান স্বীকার করেন, তারা মূলত শামসুর রাহমানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। ফলে আল মাহমুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এ বিভেদ কবিরা তৈরি করেননি; তৈরি করেছেন তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও কাছের বন্ধুরা। তিনি বলেন, প্রথম আলোতে আল মাহমুদের কবিতা, সাক্ষাৎকার ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমা থেকে তার তিনটি বই প্রকাশ হয়েছে। শামসুর রাহমানের বই হয়েছে ছয়টি। ২০০৪ সালে নাসির আলী মামুন দুই কবির একটি সাক্ষাৎকার নেন, যা অত্যন্ত ভালো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাসির আলী মামুন বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ হাজার বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি তুলেছেন। এদের মধ্যে ৩৮ জন নোবেল বিজয়ী। অক্তাবিও পাজ ও ডেরেক ওয়ালকটসহ অনেক নোবেল বিজয়ীর ছবি তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। আল মাহমুদ গ্রাম ও গ্রামীণ জীবন নিয়ে লিখেছেন, ধর্মবিশ্বাস তার কবিতায় গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে শামসুর রাহমান আধুনিক প্রজন্ম, নাগরিক সমাজ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। মামুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান। কিন্তু শামসুর রাহমান তার জবাবে আল মাহমুদকে প্রধান কবি বলতে পারেননি। রাজনীতির কারণে শিল্পীদের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষতি করেছে বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, এখন থেকে লেখক-শিল্পী-কবিদের সরাসরি রাজনীতিতে না যুক্ত হওয়াই ভালো এবং সব মত ও চিন্তাকে পত্রিকায় আনা হবে।




