লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইরান তাদের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা জোরদার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি পৃথক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা এবং মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সংক্রান্ত সরঞ্জাম সম্প্রতি ইয়েমেনে পাঠিয়েছে তেহরান।
সূত্রগুলোর মধ্যে রয়েছেন দুজন ইরানি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি এবং একজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তাদের ভাষ্যমতে, ১৩ জুলাই মাহান এয়ারের একটি ফ্লাইটে এসব সদস্য ও সরঞ্জাম ইয়েমেনে পৌঁছায়। ইরানি কর্মকর্তারা জানান, ওই উড়োজাহাজে ১০ থেকে ২১ জন আইআরজিসি সদস্য ছিলেন, যাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কমান্ডারও ছিলেন। তাদের মূল গন্তব্য ছিল হুতিনিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা। কিন্তু সৌদি–সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর হামলায় সানা বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফ্লাইটটি গন্তব্য পরিবর্তন করে হুতিনিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য হয়।
একটি সূত্র আরও দাবি করেছে, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্যই আইআরজিসির কমান্ডারদের পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে, হুতিদের কার্যক্রমে অর্থায়নের লক্ষ্যে ওই ফ্লাইটে স্বর্ণও পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে, হুতিদের সংবাদমাধ্যম–বিষয়ক কর্মকর্তা আবদেল রহমান আল-আহনোমি, যিনি নিজেও ওই ফ্লাইটের একজন যাত্রী ছিলেন, সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠানোর অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, ওই বিমানের সব যাত্রীই ছিলেন বেসামরিক। হুতিরা অতীতেও নিজেদের ইরানের প্রক্সি বাহিনী হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অস্ত্র নিজেরা তৈরির দাবি করেছে।
তবে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি ভিন্ন কথা বলেছেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, আইআরজিসির সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে আনার উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুজাহেম আলসালুমের মতে, ওই বিমানে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ছিল, যা আগে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই ফ্লাইট ইয়েমেনে পৌঁছানোর তিন দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান লোহিত সাগরের তেল পরিবহন পথ বন্ধে প্রস্তুত থাকতে হুতিদের প্রতি আহ্বান জানায়। এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং ১৩ জুলাইয়ের সানা বিমানবন্দরে হামলার জবাবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে। গত বৃহস্পতিবার তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোরও দাবি করে, যার ফলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এসব উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ১৩ জুলাইয়ের ফ্লাইটটির উদ্দেশ্য ছিল নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া হুতি প্রতিনিধিদল এবং তেহরানে চিকিৎসা নেওয়া ইয়েমেনের নাগরিকদের ফিরিয়ে দেওয়া। চলতি মাসের শুরুর দিকে হুতিরা সানা ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল, যার মাধ্যমে সৌদি অবরোধের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে বলে তাদের দাবি।




