দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না করে একই পদে বারবার পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ঘটনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি জুন থেকে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ছয় থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও কোনো পরীক্ষা বা নিয়োগ হচ্ছে না দেখে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়েই চলছে।
একটি আবেদন করতে গেলে শুধু আবেদন ফি নয়, যাতায়াত ও প্রস্তুতির খরচেও পড়তে হয় অনেক টাকা। বছর পেরিয়ে গেলেও যখন নিয়োগের অগ্রগতি দেখা যায় না, তখন তা আর্থিক ও মানসিক বোঝা হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা। তাদের ভাষ্য, প্রতিটি বিজ্ঞপ্তি আশার আলো দেখালেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ বিলম্বে সেই আলো নিভে যায়।
গত ৯ জুলাই একযোগে তিনটি পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিজিএ)। সেখানে মোট ৫৭৫টি শূন্যপদ পূরণের কথা বলা হয়েছে। অথচ এই পদের প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। সাড়ে চার বছর পার হয়েও নিয়োগ শেষ না হওয়ায় পুনরায় আবেদন চাওয়া হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরও একই পথে হাঁটছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ ১ হাজার ৪৮৫টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়। প্রায় এক বছর কেটে গেলেও প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় গত ২৪ মে আবার পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তেই এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং চলতি মাসের মধ্যে পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অবস্থা আরও জটিল। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর ৯০টি পদের জন্য পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বের হয়েছিল। পরে পদোন্নতি ও অন্যান্য কারণে আরও পদ শূন্য হওয়ায় পদের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪২ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামানের ভাষ্য, শূন্য পদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে সমন্বয় করা হয়েছে।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর তার প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আড়াই বছর পর গত ১৬ জুন আবার ৪৩১টি পদে পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ২৮০টি শূন্যপদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন আবেদনকারীরা। কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডও গত জুন মাসে পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া বছরের পর বছর নিয়োগ সম্পন্ন না করা প্রশাসনিক অদক্ষতা ও গাফিলতির নিদর্শন। তিনি বলেন, আইনের ফাঁক ব্যবহার করে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করা হয় এবং অনেকে তদবিরের চাপে কিংবা মামলার কারণে নিয়োগ আটকে দেন, পরে পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য হন।
এ পরিস্থিতিতে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ রয়েছে। পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এলেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে ফের আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সর্বশেষ নিয়োগসংক্রান্ত নোটিশ ও নির্দেশনা নিয়মিত মনিটরিং করা আবশ্যক। আবেদনপত্র, প্রবেশপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করে রাখতে হবে এবং একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে।
প্রার্থীদের মধ্যে এখন উদ্বেগ বাড়ছে দীর্ঘ বিলম্বে বয়সসীমা শেষ হওয়ার শঙ্কায়। তাদের মতে, এই আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার দাবি এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা।