গণিতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটি ফার্মার শেষ উপপাদ্যের প্রমাণের গল্প নিয়ে সাইমন সিংয়ের ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত বই 'ফার্মাস লাস্ট থিওরেম' এখনো পাঠকদের মুগ্ধ করছে। বইটিতে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে ২৬ সংখ্যাটি গাণিতিক নান্দনিকতার এক অনন্য নিদর্শন। ২৫ (৫-এর বর্গ) ও ২৭ (৩-এর ঘন)-এর মাঝখানে অবস্থিত বলে এটি এমন একমাত্র পূর্ণসংখ্যা যার আগে একটি পূর্ণবর্গ ও পরে একটি পূর্ণঘন রয়েছে। ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা নিজেই এই বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করেছিলেন।
বইটির সূচনা পিথাগোরাসের সমকোণী ত্রিভুজের উপপাদ্য দিয়ে। লেখক জানিয়েছেন, পিথাগোরাস শুধু একজন গণিতবিদই ছিলেন না, তিনি একটি গোপন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যেখানে গাণিতিক প্রমাণ নিয়ে গবেষণা হতো। সংঘের ভর্তি হতে না পাওয়া সাইক্লোন নামের এক ব্যক্তি পিথাগোরাসকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল বলেও বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
আসল নায়ক হিসেবে আবির্ভাব ঘটে পিয়েরে দ্য ফার্মার। পেশায় ফ্রান্সের একজন বিচারক হলেও গণিত ছিল তাঁর প্রকৃত প্রতিভার ক্ষেত্র। তিনি পিথাগোরাসের সমীকরণ x² + y² = z²-এ বর্গের বদলে অন্য যেকোনো ঘাত বসিয়ে দেখান যে n>2 হলে xⁿ + yⁿ = zⁿ সমীকরণের কোনো পূর্ণসংখ্যা সমাধান নেই। ১৬৩৭ সালের দিকে তিনি দাবি করেন যে তাঁর কাছে এর একটি চমৎকার প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু সেটি কোথাও লিখে যাননি।
এই এক দাবি পরবর্তী সাড়ে তিনশ' বছর ধরে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের পাগলের মতো ছুটিয়ে বেড়ায়। ফরাসি নারী গণিতবিদ সোফি জার্মেইন পুরুষের ছদ্মনামে গবেষণা চালিয়ে ফার্মার সমস্যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান দেন। এভারিস্ত গ্যালোয়া তার যুগান্তকারী গাণিতিক আবিষ্কারের পরপরই একটি ডুয়েলে প্রাণ হারান। জাপানের তরুণ গণিতবিদ ইউতাকা তানিয়ামা এলিপটিক কার্ভ ও মডুলার ফর্মসের মধ্যে সম্পর্কের ধারণা দেন, যা ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। তানিয়ামা নিজে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
দীর্ঘ এই নাটকের সমাপ্তি টানেন আধুনিক গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। বহু বছরের সাধনার পর ১৯৯৪ সালে তিনি এলিপটিক কার্ভ ও মডুলার ফর্মসের মধ্যে যৌক্তিক সেতুবন্ধন তৈরি করে ফার্মার উপপাদ্যের সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন করেন। এর আগে গণিতবিদেরা মনে করতেন এই দুটি শাখার মধ্যে কোনো মিল নেই। ওয়াইলস প্রথম প্রমাণে একটি ভুল আবিষ্কার করলেও দমে না গিয়ে তা সংশোধন করে চূড়ান্ত প্রমাণ দেন। তাঁর এই কাজ ল্যাংল্যান্ডস প্রোগ্রামের একটি বড় সাফল্য, যা ১৯৬৭ সালে গণিতবিদ রবার্ট ল্যাংল্যান্ডস প্রস্তাব করেছিলেন। ল্যাংল্যান্ডস প্রোগ্রাম গণিতের বিভিন্ন শাখার মধ্যে গভীর যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করে এবং ২০২৪ সালেও এর ওপর ভিত্তি করে হারমোনিক অ্যানালাইসিসে নতুন প্রমাণ হাজির করেছেন গবেষকেরা।
সাইমন সিং তাঁর বইয়ে গাণিতিক প্রমাণকে শিল্পকর্মের সাথে তুলনা করেছেন। দীর্ঘ ও জটিল যুক্তির ধারাকে তিনি বিমূর্ত সৌন্দর্যের প্রকাশ বলে বর্ণনা করেছেন। পিথাগোরাস থেকে ওয়াইলস পর্যন্ত গণিতের ইতিহাস, চরিত্রদের জীবনী ও তাদের সংগ্রামের গল্প জীবন্ত করে তোলা এই বই গণিতের জাদুকরী জগতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য একটি চমৎকার সংযোজন।

