ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একক সংগীতসন্ধ্যা ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পর মঞ্চে এসে দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যাঁরা’ দিয়ে তিনি তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন। এরপর একে একে তিনি গেয়ে শোনান ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’ এবং প্রথমবারের মতো নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’। দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে রাত সোয়া ৯টায় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গেয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আসর শেষ করেন তিনি।
পুরো অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দেশের খ্যাতিমান অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রকর আফজাল হোসেন। এক পর্যায়ে তাকে মঞ্চে ডেকে আনেন রুনা লায়লা এবং ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আপনি আপনার ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে এসেছেন, এ জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।’ এরপর তাঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে মজার ছলেই বললেন, ‘আমি কিন্তু সবার সঙ্গে হাত মেলাই না। কারণটাও জেনে নেন—আংটিগুলো আছে না, এগুলো যদি হুট করে কেউ নিয়ে নেয়!’ কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই মিলনায়তন জুড়ে হাসির রোল ওঠে। এরপর আবার তিনি বলেন, ‘কিন্তু উনি (আফজাল হোসেন) তো নিরাপদ।’
রুনা লায়লার হাতে থাকা হীরার আংটির সংগ্রহ নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ নতুন নয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে করাচিতে মা আমিনা লায়লার কাছ থেকে পাওয়া একটি ডায়মন্ডের আংটি দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর এই সংগ্রহের পথচলা। পরবর্তীতে পেশাদার সংগীতজীবনে নিজের পছন্দে আরও নানা হীরার আংটি সংগ্রহ করেছেন তিনি। মঞ্চে তাঁর পরিবেশনার মতোই হাতে থাকা বাহারি আংটিগুলোও সবসময় দর্শকের নজর কেড়ে আসছে। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া গানগুলো গাইতে গাইতে তিনি যেন ছুঁয়ে গেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের স্মৃতি, ভালোবাসা আর অনুভূতি।
রুনা লায়লার কথার পর স্মৃতিচারণা করেন আফজাল হোসেন। প্রায় ৪০ বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনের বিস্ময়গুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা আজও সেই বিস্ময় হয়ে আছেন।’ বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুর দিনের স্মৃতি মনে করে তিনি জানান, ‘আমি তখন নতুন অভিনয় শুরু করেছি। রিহার্সাল শেষে দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি। আর রুনা লায়লা স্টুডিও থেকে বের হয়ে আসছেন। তিনি আমাকে দেখেননি, কিন্তু আমি দূর থেকে তাঁকে দেখছিলাম। হঠাৎ কথাটা মনে হলো, মাথাটা তখন যেন ঘুরছে। আমি সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ কেন এমন অনুভূতি হয়েছিল, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আমরা তারকাখ্যাতির অনেক রূপ দেখেছি। সময়ের সঙ্গে অনেকের সেই দীপ্তি ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু রুনা লায়লা নিজেকে যেভাবে বিশেষ করে রেখেছেন, তাই তিনি আজও সত্যিকার অর্থেই আকাশের তারকা। চার দশক আগে যেমন তাঁর তারকাদীপ্তি ছিল, আজও ঠিক তেমনই আছে।’
এই একক সংগীতানুষ্ঠান ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ৭০০ আসনের জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে একটি আসনও ফাঁকা ছিল না। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। প্রতিটি গান শেষে মিলনায়তনজুড়ে করতালি আর উচ্ছ্বাস যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—সময় বদলায়, কিন্তু রুনা লায়লার গান প্রজন্মের পর প্রজন্মে একই রকম আবেদন নিয়ে বেঁচে থাকে।




