চট্টগ্রামের প্রধান দুই নদী কর্ণফুলী ও হালদার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং তা মানব স্বাস্থ্যের জন্যও সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা এবং সরেজমিন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা নদীর পানি ও তলদেশ থেকে শুরু করে জলজ প্রাণীর দেহে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রবেশের পথ তৈরি করেছে।

কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে সদরঘাট এলাকা পর্যন্ত ঘুরলে দূষণের চিত্র চোখে পড়ে। পানির ওপরে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, বোতলের ঢাকনা, ছেড়া স্যান্ডেল এবং মাছ ধরার জালের টুকরার মতো অজস্র বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। তবে চোখে দেখা এই ভাসমান বর্জ্যের চেয়েও ভয়াবহ বিপদ লুকিয়ে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার আকারে। সূর্যের আলো, পানি ও ঘর্ষণের প্রভাবে বড় প্লাস্টিকগুলো ভেঙে এমন কণায় পরিণত হয়, যা খালি চোখে ধরা পড়ে না।

গবেষণার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্ণফুলীর ২৪টি স্থান থেকে বিভিন্ন মৌসুমে সংগৃহীত নমুনায় প্রতি ঘনমিটার পানি ১৪.২৪ থেকে ২৬.৬৮টি এবং প্রতি কেজি শুকনো পলিতে ৭৫.৬৩ থেকে ২৭২.৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ দূষণের চিত্র মিলেছে নগরী, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের প্রভাব বিস্তার করা নদীর নিম্নপ্রবাহে। এই কণাগুলোর বড় উৎস হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে পানির বোতল, খাদ্যের মোড়ক, সিনথেটিক কাপড়, সিগারেটের ফিল্টার এবং নানা শিল্পপণ্য।

প্লাস্টিক কণা শুধু পানিতে ভেসে থাকে না, বরং জোয়ার-ভাটা ও স্রোতের মাধ্যমে নদীর তলদেশে জমা হয় এবং পরে ড্রেজিং বা পরিবর্তিত অবস্থায় আবারও পানিতে মিশে যায়। অর্থাৎ এই দূষণ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হচ্ছে।

অন্য দিকে, বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর চিত্র বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে পরিস্থিতি ভয়াবহ। চলতি বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হালদার আট প্রজাতির ৪৮টি পরীক্ষিত মাছের প্রতিটি্যের শরীরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ৬.৫টি এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী পেশিতে গড়ে ৬.১টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণা সম্প্রতি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্স’ নামক জার্নালে প্রকাশ পায়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, তৃণভোজী মাছের দেহে মাংসাশী মাছের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। কারণ, প্ল্যাঙ্কটন ও ক্ষুদ্র খাদ্যকণা গ্রহণর সময় তারা সহজেই প্লাস্টিক কণা গিলে ফেলে। আকারে আধা মিলিমিটারের চেয়েও ছোট এসব তন্তু আকৃতির প্লাস্টিক কণাকে প্রাকৃতিক খাবার থেকে আলাদা করা জলজ প্রাণী পক্ষে প্রায় অসম্ভব। উভয় নদীতেই সর্বাধিক পাওয়া গেছে সিনথেটিক কাপড়, মাছের জাল, দড়ি ও বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্য থেকে উৎপন্ন ফাইবার জাতীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু একটি দূষক নয়, এটি ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকও বহন করতে পারে, যা মাছের দেহে প্রবেশ করলে এর প্রভাব আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি আরও জানান, আগে নদী দূষণ বলতে অক্সিজেনের ঘাটতি বা ভারী ধাতুর মতো বিষয়গুলো আলোচিত হলেও এখন সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত হয়েছে, যা খালি চোখে দেখা যায় না এবং সহজে অপসারণযোগ্যও নয়।

দূষণের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, কর্ণফুলীর ক্ষেত্রে নগরীর খাল-নালা ও অপরিশোধিত নর্দমার পানি, সমুদ্রবন্দর, ইপিজেড এবং অসংখ্য শিল্পকারখানার বর্জ্যই প্রধান কারণ। অন্যদিকে হালদার দুই তীরে ভারী শিল্প কম থাকলেও বিভিন্ন শাখা খাল, উজানের জনবসতি, কৃষি ও গৃহস্থালি বর্জ্যের মাধ্যমে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি ও চুয়েটের প্রথম উপাচার্য মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের মতে, সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, প্রশাসনিকও। তিনি বলেছেন, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) আছে, সেগুলো প্রায়ই চালু থাকে না, এবং থাকলেও তার প্রযুক্তি মাইক্রোপ্লাস্টিক আটকাতে পারে না। তাই কঠোর তদারকি ও ইটিপির আধুনিকায়ন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। গবেষকদের মতে, এই অদৃশ্য দূষণ রোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য, কারণ একবার নদীতে প্রবেশ করা এই কণা আর অপসারণ করা সম্ভব নয়।