বাংলাদেশের প্রজনন স্বাস্থ্য খাতে এক অপ্রত্যাশিত ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) শূন্য দশমিক ১ বেড়ে এখন ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছেছে। এর আগে ২০১১ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই হার ২ দশমিক ৩-এ স্থিতিশীল ছিল। এই সামান্য বৃদ্ধি দেশের জনসংখ্যার গতিপথে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ এই প্রবণতাকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিরূপণের জন্য গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের একাধিক শিক্ষকও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়া এবং মাঠপর্যায়ে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর তীব্র সংকটই এই অবস্থার জন্য দায়ী।
অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে মোট ৫৪ হাজার ২২৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে ২৭ শতাংশ (১৪ হাজার ৫৫০টি) পদ শূন্য রয়েছে। এই জনবল সংকটের কারণে মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ ও সেবা দিতে পারছেন না। মুন্সিগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মোহাম্মদ ফকরুল আলম জানান, তাঁর জেলায় অনুমোদিত ৭৮১টি পদের মধ্যে ৫৩ শতাংশই ফাঁকা। শ্রীনগর ইউনিয়নের পরিবারকল্যাণ সহকারী রোকেয়া বেগমের ভাষ্যমতে, পাঁচজনের কাজ একা সামলাতে গিয়ে একটি পরিবারে ফিরে যেতে তাঁর নয় মাসের বেশি সময় লেগে যায়।
শুধু জনবল নয়, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই সরকারিভাবে বড়ি, কনডম, ইনজেকটেবল, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের নিয়মিত সরবরাহ কমে যায়। কেন্দ্রীয় পণ্যাগার থেকে আঞ্চলিক ও উপজেলা পণ্যাগারে পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। গত মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ আঞ্চলিক পণ্যাগারে মুখে খাওয়ার বড়ি, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের কোনো মজুতই ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবহারকারীর হারে। এমআইসিএস তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহারকারীর হার (সিপিআর) যেখানে ৬২.৭ শতাংশ ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ৫৮.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অপূর্ণ চাহিদার হার বেড়ে বর্তমানে ১০ শতাংশ দম্পতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাচ্ছেন না।
এ অবস্থার জন্য গত সরকারগুলোর নীতি ও মনোভাবকেও দায়ী করছেন জনসংখ্যাবিদরা। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে ‘শক্তি’ বলে অভিহিত করেন এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই বক্তব্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০১২ সালের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিতে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগান থাকলেও ২০১৮ সালে সরকার পুনরায় ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানে ফিরে যায়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এনজেন্ডার হেলথের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর আবু জামিল ফয়সাল অভিযোগ করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেননি এবং সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের সভা হয়েছে মাত্র একবার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগ বিলুপ্ত করার উদ্যোগ ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। বিসিএস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাশেম বলেন, স্বাধীন অধিদপ্তর না থাকলে জনসংখ্যাবিষয়ক কাজগুলো গুরুত্ব হারাবে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে জনসংখ্যা ইস্যুতে সরাসরি প্রতিশ্রুতি না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া উদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তারা এই ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজে পরিবার পরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্ত করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্ট-২০২৪-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, টিএফআর ২.৩ থাকলে ২০৩১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ১৮ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু বর্তমান বর্ধিত হার (২.৪) ধরলে ওই সময়ে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি ৩৮ লাখে—অর্থাৎ পাঁচ বছরে ৫৮ লাখ মানুষের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। ২০৩৬ সালে এই পার্থক্য বেড়ে ৯৬ লাখে পৌঁছাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের যত কম সময়ে সম্ভব টিএফআর ২.১-এ নামাতে হবে। প্রতিস্থাপনযোগ্য এই হার অর্জনই এখন সবচেয়ে জরুরি।’ বর্তমান সঙ্কট উত্তরণে বাংলাদেশ জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্র (২০২৫-২০৩০)-এ সেবা সহজলভ্যকরণ, মানোন্নয়ন ও শহরে সেবা জোরদারের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।




