চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে বন্যার পানি যখন গভীর রাতে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় ষাটোর্ধ্ব আশা খাতুনের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠিকানা। ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’—পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। স্বামী আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুর পর তিন মেয়ে ও দুই দিনমজুর ছেলেকে নিয়ে সঞ্চয়ের সবটুকু ঢেলে তৈরি করা মাটির ঘরটিই ছিল তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্বল। অথচ এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানির বিস্তার। ধানের গোলা, চাল, হাঁস-মুরগি, পুকুরের মাছ—কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তিনি বিলাপ করে বলেন, ‘আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’ অর্থাৎ কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, মাথা গোঁজার জায়গাই বা কোথায় পাবেন, তা জানা নেই।
গতকাল রোববার দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে নিজের ভিটার কাছে গিয়েও কোনো অবশিষ্ট খুঁজে পাননি তিনি। শুধু ছেঁড়া শাড়িটির দিকে চেয়ে বলেন, ‘এই এক কঅর লই বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি।’ তাঁর মতো গ্রামের অনেকেই এখনো প্রতিবেশীর পাকা দালানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে। মাঠ, পুকুর ও গাছপালা একাকার হয়ে গেছে। বহু মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও টিনের চালা কেবল পানির ওপর থেকে উঁকি দিচ্ছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কাদা সরাচ্ছেন, কেউ নষ্ট জিনিসপত্রের সন্ধান করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের পানি এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে যে গবাদিপশু, চাল-ডাল বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরানোর ফুরসত পাননি কেউ।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনপদকে অল্প দিনেই বন্যাকবলিত করে তোলে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত নগরীতে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, যার মধ্যে শেষ ২৪ ঘণ্টায় হয়েছিল ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। পূর্বাভাস বলছে, আগামী দুই-তিন দিনেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বাঁশখালীতেই ধাক্কাটা সবচেয়ে তীব্র। ৬ জুলাই থেকে উপজেলার বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়; কোনো কোনো জায়গায় প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কয়েক দিন আগে পানি কিছুটা নামলেও গতকালের বৃষ্টিতে আবার বাড়তে শুরু করেছে। ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব’—আশা খাতুনের এই আর্তি এখন বাঁশখালীর বহু মানুষের প্রতিধ্বনি।




