কক্সবাজার শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৫১টি পাহাড়ে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে, যেখানে কয়েক লাখ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করছেন। সদ্য সমাপ্ত এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে, যাতে পাঁচজন মাদ্রাসাছাত্রীসহ কমপক্ষে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য বলছে, ২০০৮ থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরের ব্যবধানে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন।

এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, এই সময়কালে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর ছিল ২০১০, যখন টানা ভারী বর্ষণে ১৫ জুন একদিনেই ৬২ জন মারা যান। এছাড়া ২০২০ সালে ২৯ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৪।

শহরের বাদশাঘোনা এলাকার একটি ৭০-৮০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া, পাদদেশ ও ঢালে নির্মিত হয়েছে অন্তত ৬০০টি টিনের বাড়ি। গত সোমবারও সেখানে নতুন করে পাহাড় কাটার চিহ্ন ও নতুন ঘর তৈরি হতে দেখা গেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, একজন বিএনপি নেতার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকায় দুই গন্ডা পাহাড়ি জমির দখল নিয়ে তার স্বামী সেখানে ঘর তুলেছেন। তবে ওই নেতার নাম তিনি প্রকাশ করেননি।

পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামালের ভাষ্য, রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে ১০-১২টি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে পাহাড় কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতারা সংসদ সদস্যের নামে পাহাড়ি জমি বিক্রি করতেন, আর ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী রোহিঙ্গা শ্রমিকদের দিয়ে পাহাড় কাটছেন। পৌর বিএনপির এক সদস্য জানান, আগে আওয়ামী লীগের নামে পাহাড় কাটা হতো, এখন ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে তা চলছে।

পরিবেশবাদীদের দাবি, গত তিন দশকে পৌর এলাকার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫১টি সরকারি পাহাড় কেটে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি পাকা বাড়ি, নয় হাজার আধা পাকা টিনের ঘর এবং বাকিগুলো ত্রিপল ও বাঁশের বেড়ার তৈরি। এসব বসতিতে দুই লাখের বেশি মানুষের বাস, যাদের ৮০ শতাংশই ভাসমান শ্রমজীবী ও জলবায়ু উদ্বাস্তু; এছাড়া ৩৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাও এখানে অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জেলা সভাপতি করিম উল্লাহ সতর্ক করে বলেন, পাহাড় কাটার ফলে শুধু মাটি নয়, হাজারো গাছপালাও ধ্বংস হচ্ছে, বন্য প্রাণীর আবাস নিশ্চিহ্ন হচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতা হারিয়ে পাহাড়গুলো জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির পানি সরাসরি নালায় গড়িয়ে নালা-ড্রেন ভরাট করে ফেলায় আধঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহর ডুবে যায়।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান স্বীকার করেন, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় পাহাড়ের বসতি উচ্ছেদ করা কঠিন। গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে সরানো হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। পৌর প্রশাসনের তথ্যমতে, তিন বছর আগে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা ৯ হাজারের বেশি মানুষের তালিকা করা হলেও পুনর্বাসন সুবিধার অভাবে তাদের সরানো যায়নি, এখন সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, ২০১০ সাল থেকে পাঁচ শতাধিক দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা এবং পাহাড় নিধনের ২২০টি মামলা করা হয়েছে। গত এক বছরে বন বিভাগ ৩০৪টি মামলা করলেও আসামি খুব কমই ধরা পড়েছে। জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দুর্গম পাহাড়ে রাতের অন্ধকারে চলা পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।