দেশে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু, কিশোর ও তরুণের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেকের ধারণা, এই রোগে আক্রান্ত হলে আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় না। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে এই ধারণা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ, রক্তের শর্করা মাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় জীবন যাপন করতে সক্ষম।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ইনসুলিনই টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রধান ও সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। রোগী অসুস্থ থাকলে বা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ইনসুলিন ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। রক্তের শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্য গ্লুকোমিটার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করা উচিত। এর ফলে ইনসুলিনের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ এবং খাদ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে রোগীদের জন্য ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফল—সব ধরনের খাবারই গ্রহণযোগ্য। তবে খাবারের পরিমাণ এবং খাওয়ার সময়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা, সাইকেল চালানো অথবা অন্যান্য শারীরিক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যায়াম শুরুর আগে এবং পরে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজনে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিকল্পনাও রাখতে হবে।
রোগীর যদি হঠাৎ ঘাম, কাঁপুনি, অতিরিক্ত ক্ষুধা, মাথা ঘোরা বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে তা রক্তের শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব সময় গ্লুকোজ ট্যাবলেট, চিনি বা মিষ্টি পানীয় সঙ্গে রাখা ভালো। জ্বর, সংক্রমণ, বমি বা ডায়রিয়ার মতো শারীরিক অসুস্থতার সময় রক্তের শর্করা এবং প্রয়োজনে কিটোন পরীক্ষা করা উচিত। এ সময় পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে প্রতি তিন মাস অন্তর এইচবিএ১সি পরীক্ষা করানো উচিত। বছরে অন্তত একবার চোখ, কিডনি, স্নায়ু ও থাইরয়েডের মূল্যায়নও অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় নির্দেশিকার আলোকে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একটি শিশু বা কিশোর টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে তার পরিবারের সদস্য, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত ইনসুলিন নেওয়া, রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত খাবার গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা। রোগীকে ভয় দেখানো বা অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ না করে বরং তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ হলেও সঠিক চিকিৎসা এবং আত্মপরিচর্যার মাধ্যমে এটি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা এবং পরিবারের সহযোগিতা—এই রোগ নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশে সচেতনতা বৃদ্ধি, ইনসুলিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত ডায়াবেটিস সেবার প্রসার ঘটাতে পারলে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতিটি মানুষ আরও নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় জীবন গড়তে পারবেন।




