গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে—কফি এনিমা নামে প্রচারিত এই ভাইরাল ডিটক্স পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রমাণে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ২০২০ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউতে গবেষকরা দেখেছেন, স্ব-প্রয়োগকৃত কফি এনিমা সম্পর্কিত প্রকাশিত কেস রিপোর্টগুলোতে বিভিন্ন ক্ষতিকর ঘটনার বিবরণ মিলেছে, কিন্তু উপকারিতার পক্ষে কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। তাই গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের মতে, এটি ঘরোয়া স্বাস্থ্যচর্চা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে তরল প্রবেশ করানোর চিকিৎসাগত পদ্ধতি, যা সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কফি এনিমায় মানসম্মত তরলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় তৈরি কফি। চিকিৎসকের নির্দেশে ব্যবহৃত এনিমা এবং ঘরে বসে কফি দিয়ে শরীর পরিষ্কারের চেষ্টা—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া, লিভার পরিষ্কার রাখা কিংবা ওজন কমানোর মতো নানা দাবি করা হয় এই পদ্ধতি নিয়ে, অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলোর পক্ষে শক্ত প্রমাণ অনুপস্থিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিটক্স শব্দটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, দূষণ, কম ঘুম ও মানসিক চাপের কারণে অনেকেই মনে করেন, শরীরকে মাঝে মাঝে পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সুস্থ শরীরে বর্জ্য ও বিপাকজাত পদার্থ বের করে দেওয়ার জন্য লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রের নিজস্ব কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। তাই বিষমুক্ত করার জন্য কফি এনিমা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ মেলেনি। শরীর সুস্থ রাখতে নাটকীয় ক্লিনজের চেয়ে পর্যাপ্ত পানি, সুষম ও আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুমই বেশি কার্যকর।
এই পদ্ধতির সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে অন্ত্রের প্রদাহ অন্যতম। ২০২০ সালের ওই পর্যালোচনায় অন্ত্রের প্রদাহসহ একাধিক ক্ষতিকর ঘটনার তথ্য উঠে আসে। একটি কেস রিপোর্টে উল্লেখ আছে, কফি এনিমার পর একজন সুস্থ ব্যক্তির প্রোক্টোকোলাইটিস—অর্থাৎ মলদ্বার ও কোলনের প্রদাহ—দেখা দিয়েছিল। ওই ব্যক্তির তলপেটে ব্যথা, রক্তপাত ও বারবার মলত্যাগের তীব্র অনুভূতি দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ পেট পরিষ্কার বা দ্রুত ওজন কমানোর আশায় নেওয়া একটি পদ্ধতি উল্টো অন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
ঘরে বসে এনিমা তৈরি ও ব্যবহারের সময় পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা তরল জীবাণুমুক্ত না হলে শরীরে জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি থাকে। কফি এনিমা নিয়ে চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিবেদনে গুরুতর সংক্রমণ এমনকি সেপসিসের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে। সেপসিস হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, যা বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতাকে বিপন্ন করতে পারে। কোনো কিছু প্রাকৃতিক বা ঘরোয়া হলেই সেটি নিরাপদ—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইট হৃদ্স্পন্দন, স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। বারবার এনিমা ব্যবহার করলে শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কফি এনিমার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও চিকিৎসাবিষয়ক সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ময়নাতদন্তে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঘটনা বিরল হলেও ঝুঁকিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে হৃদ্রোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকা ব্যক্তিদের জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
কোষ্ঠকাঠিন্যের দ্রুত সমাধান হিসেবে কেউ কেউ এনিমার ওপর নির্ভর করতে পারেন। এতে সাময়িকভাবে মলত্যাগ হলেও বারবার ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে ভালো সমাধান নয়। অতিরিক্ত এনিমা ব্যবহারে কোলনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যও তৈরি হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বারবার ঘরোয়া উপায়ে সমস্যা সামলাতে গিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকৃত কারণ—যেমন খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ, হরমোনজনিত সমস্যা বা অন্য শারীরিক কারণ—অজানাই থেকে যেতে পারে। কফি এনিমা এসব কারণ চিহ্নিত করে না।
শরীর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শক্তি বাড়ানো, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করা—কফি এনিমা নিয়ে দাবির শেষ নেই। কোথাও কোথাও গুরুতর রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবেও এটি প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কিছু জনপ্রিয় হলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ বা কার্যকর হয়ে যায় না। গবেষকরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় কফি এনিমাকে স্ব-যত্নের পদ্ধতি হিসেবে সুপারিশ করা যায় না।
কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই এনিমা করতে হবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাই উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, খাবারে আঁশের পরিমাণ বাড়ানো, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক তাগিদ দীর্ঘ সময় চেপে না রাখা সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে তীব্র ব্যথা, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মলত্যাগের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ সব সমস্যার সমাধান ডিটক্স নয়।
কফি কারও সকালের প্রিয় অভ্যাস হতে পারে। এক কাপ গরম কফির ঘ্রাণ মন ভালো করে দিতে পারে, ক্লান্ত বিকেলে এনে দিতে পারে সতেজতা। কিন্তু পরিচিত কোনো খাবার বা পানীয়কে শরীরের অন্য পথে ব্যবহার করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। কফি এনিমার ক্ষেত্রেও কথাটি মনে রাখা জরুরি। সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হেলথলাইন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ, গুড আর এক্স এবং ইন্সটাগ্রাম পোস্টের কথা।




