শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করল মজার ইশকুল। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। আগারগাঁও ও মানিকনগর—এই দুই শাখা মিলিয়ে মোট ২০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে বসেছিল। মানিকনগর শাখা থেকে ১২ জনের মধ্যে ১১ জন উত্তীর্ণ হওয়ায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯২ শতাংশে। সংখ্যাটি সীমিত মনে হতে পারে, তবে এর পেছনের সংগ্রামের গল্প অনেক বড়।
এই অর্জনের পেছনে রয়েছে ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ যাত্রা। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এমন শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যাদের জীবনে বিদ্যালয় ছিল অচেনা একটি ধারণা। অনেকে রাস্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল, কেউবা বস্তিতে বেড়ে উঠেছিল। কারও পরিবারে মায়ের একমাত্র উপার্জনে সংসার চলত, কারও বাবার অনুপস্থিতি ছিল কঠিন বাস্তবতা। অনেক ঘরের জন্য পরবর্তী দিনের খাদ্যের কোনো গ্যারান্টি ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে একটি শিশুকে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং তার পরিবারকে পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝানো—এটিই ছিল প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ।
এই ব্যাচের ফলাফলে সুমাইয়ার গল্পটি বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। জিপিএ ৩.৭২ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তার মা অফিস কক্ষে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। বারবার শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, এই প্রতিষ্ঠান না থাকলে মেয়েকে এত দূর পর্যন্ত পড়ানোর সামর্থ্য তার ছিল না। তবে নতুন উদ্বেগও দেখা দিয়েছে—কলেজের খরচ কীভাবে জোগাড় হবে। প্রতিষ্ঠানটি আশ্বস্ত করেছে, সুমাইয়ার পাশে থাকার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ ৪.৮৩ অর্জন করে কুলসুম স্কুলের সর্বোচ্চ ফল করেছেন। যে পরিবেশে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না, সেখানে তিনি কঠিন বিজ্ঞান বিভাগ বেছে নিয়ে নিজের পরিবারের প্রথম এসএসসি উত্তীর্ণ ব্যক্তি হয়েছেন। রিকশাচালক বাবার স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হওয়ায় তার আনন্দ দ্বিগুণ। একই সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় গর্ববোধ করছেন। এই সাফল্যের পর তার পরিবার নতুনভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৭২ পাওয়া তাসপিয়ার গল্পও অনুপ্রেরণাদায়ক। আগারগাঁওয়ের কুমিল্লা বস্তির বাসিন্দা তাসপিয়া বর্ণ পরিচয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত দীর্ঘ পথ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে হেঁটেছে। তার সমবয়সী অনেক মেয়ের ইতিমধ্যে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, কিন্তু সেই বাস্তবতাকে অতিক্রম করে তিনি এখন কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার ফল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে এবং পরিবারের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে।
এই ফলাফলগুলো কেবল সংখ্যার খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম প্রশ্ন কখনোই ছিল না তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে কি না। বরং তারা স্কুলে টিকে থাকবে কি না, আর্থিক চাপ তাদের শিশুশ্রমে ঠেলে দেবে কি না, মেয়েদের বাল্যবিবাহ হবে কি না, অথবা পরিবার অন্যত্র চলে গেলে পড়াশোনা থেমে যাবে কি না—এগুলোই ছিল বাস্তব উদ্বেগ। অনেকের ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল না; জন্মসনদ তৈরির জন্য অভিভাবকদের সঙ্গে বারবার বসে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে হয়েছে। বাইরে থেকে ছোট মনে হওয়া এসব কাজই অনেক সময় শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাই একটি শিশুকে পরীক্ষার হলে বসতে দেখার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রতিষ্ঠানটি কখনোই পরীক্ষার সনদকে শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখেনি। একটি শিশুকে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করাই সাফল্য। তাকে নিয়মিত স্কুলে ফিরিয়ে আনা, পরিবারের প্রথম এসএসসি পরীক্ষার্থী হওয়া—এসবই অর্জনের অংশ। কুলসুম, তাসপিয়া ও সুমাইয়ার মতো শিক্ষার্থীরা যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, তখন সেটি আরও বৃহত্তর সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়। শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট দেয় না; এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং পারিবারিক বাস্তবতা বদলানোর স্বপ্ন জাগায়।
এসএসসির পরবর্তী পথ নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। ১৮ বছরের বেশি বয়সী দুই শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যরা কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি চায়, কেউ উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাক, কেউ দক্ষতা অর্জন করুক, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করুক—পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য একটাই, যেন তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
এই ১৪ বছরের যাত্রায় স্পষ্ট হয়েছে, কোনো একক প্রতিষ্ঠান একা একটি শিশুর জীবন বদলাতে পারে না। শিক্ষক, পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক, দাতা ও স্পনসর এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান—সবাই প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি দরকার এমন মানুষের, যারা দীর্ঘদিন বিশ্বাস রাখবেন যে এই শিশুটিও সক্ষম। প্রথম ব্যাচের সাফল্যের পেছনেও অসংখ্য মানুষের শ্রম রয়েছে। তাই এই অর্জন কোনো ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি অনেকের ছোট ছোট প্রচেষ্টার সম্মিলিত ফল।
২০১৩ সালে কয়েকটি শিশুকে নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পেছনে ছিল পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশের একটি বড় স্বপ্ন। ১৪ বছর পর এসে বোঝা যায়, এই স্বপ্নের কোনো সহজ পথ নেই। একটি শিশুকে স্কুলে আনার চেয়ে তাকে বছরের পর বছর ধরে রাখার কাজ আরও কঠিন। মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানো দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। এরপর উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। সুতরাং প্রথম এসএসসির ফলাফল কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি নতুন শুরুর ইঙ্গিত। ২০১৩ সালে শুধু বিশ্বাস ছিল—ওরাও পারবে। ২০২৬ সালে এসে সেই বিশ্বাস এখন কেবল স্বপ্ন নয়; কয়েকটি তরুণের হাতে তার প্রমাণও রয়েছে, তাদের এসএসসি সনদ।




