টানা ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ দল। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সফরকে সামনে রেখে দলের সবচেয়ে জ্বলন্ত সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের ভয়াবহ ফর্মহীনতা। চোটের কারণে আগে থেকেই দলে অনুপস্থিত লিটন দাস, শরীফুল ইসলাম এবং নাহিদ রানা। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচকরা একটি সুস্থির দল চাইলেও, ওপেনারদের পারফরম্যান্সের ক্রমাবনতি তাদের কঠিন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে রাখা তিন উদ্বোধনী ব্যাটাররাই যেন এক অনিশ্চিত কুয়াশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তানজিদ হাসান এখন পর্যন্ত নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র একটি টেস্ট খেলেছেন। অন্যদিকে, সৌম্য সরকার প্রায় পাঁচ বছর পর এই ফরম্যাটে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। এই দুজন ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে একাদশের বাইরে থাকা সাদমান ইসলামকে নিয়েই গড়া হয়েছে দলের ওপেনিং কম্বিনেশন। বাস্তবতা হলো, হাতের কাছে থাকা এটাই সেরা বিকল্প। ঘরোয়া ক্রিকেটে সৌম্যর পেসবান্ধব উইকেটে খেলার পূর্বঅভিজ্ঞতা আর তানজিদের আগ্রাসী শুরু দেয়ার সামর্থ্যর মতো 'তাত্ত্বিক' ভরসাগুলোই এখন দলের মূল সম্বল।

পরিসংখ্যান এই সংকটের ভয়াবহতাই কেবল তুলে ধরে। ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) সূচনালগ্ন থেকে হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের কোনো ওপেনারের সর্বশেষ সেঞ্চুরি এসেছিল আনুমানিক চার বছর আগে, ভারতের বিপক্ষে। সেই সেঞ্চুরিয়ান জাকির হাসান পরবর্তী ১৩টি ইনিংসের একটিতেও পঞ্চাশ ছোঁয়া ব্যর্থ হয়ে দলের বাইরে আছেন। তারও আগে, ২০২২ সালের মা মাসে তামিম ইকবাল একটি সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন, যিনি এখন দেশের ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি। তামিম দীর্ঘকাল ধরেই দলের মূল ভরসা ছিলেন। তার অবসরের পর থেকে এখন পর্যন্ত সাতজন ভিন্ন ব্যাটসম্যান উদ্বোধন করতে নেমেছেন, খেলেছেন মোট ২১টি টেস্ট। এই সময়ে তাঁদের সম্মিলিত অর্জন বলতে শুধু ১০টি ফিফটি; সেঞ্চুরি একটি বটে হয়নি। ডব্লিউটিসিতে অংশ নেওয়া সব দলগুলোর মাঝে এটিই সবচেয়ে বাজে রেকর্ড।

গত দুইবছরে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। মাহমুদুল হাসান আয়ারল্যান্ড ও সাদমান ইসলাম জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গত বছর সেঞ্চুরি পেলেও সেই ম্যাচগুলি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ ছিল না। সবচেয়ে বেশি ১০টি ইনিংসে ইনিংস উদ্বোধনকারী এই দুইজনই পরবর্তীতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর মাহমুদুলের পারফরম্যান্স এমন খারাপ হয়ে যায় যে শেষ ছয় ইনিংসের চারটিতে এক অঙ্কের ঘরে আউট হওয়ার সুবাদে তাকে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দল থেকেই বাদ দিতে বাধ্য হন নির্বাচকরা। এই দৃশ্যচিত্রে এনামুল হক বা জাকির হাসানের নামগুলোও একই ব্যর্থতার ইতিহাসে যুক্ত হয়ছে। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ডব্লিউটিসিতে ইনিংসপ্রতি প্রথম জুটিতে আসা ২০.১৭ রান বাংলাদেশের ওপেনারদেরই নামের পাশে জুড়েছে সর্বনিম্ন ব্যাটিং গড়ের তকমা।

এই তিক্ত বাস্তবতা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ পা রাখবে এমন এক কন্ডিশনে, যেখানে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডের গতি ও বাউন্সের মোকাবিলা করতে হবে। দেশ ছাড়ার আগে টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন উদ্রেক সংশয়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, উদ্যোগী ব্যাটারদের কাছ থেকে ধারাবাহিক পারফর্মম্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও যোগ করেন, 'ওপেনিং পজিশনটি অনেক কঠিন, এটাও বুঝতে হবে। সব সময় অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে। কখনো দিনের পাঁচ ওভার বাকি তখন নামতে হচ্ছে, আবার কখনো ভেজা উইকেটে ব্যাটিং করতে হচ্ছে।'তবে নাজমুলের বিশ্বাস, তার ওপেনাররা এই চ্যালেঞ্জকে জয় করার চেষ্টার কোনো ঘাটতি রাখছেন না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পেসারদের বৈচিত্রের কারণে গতি, সুইং আর বাউন্সের দিক থেকেটেস্ট এখন সত্যিকারের পরীক্ষা নিয়ে আসে। ওপেনাররা যদি সেই কঠিন প্রথম প্রহরটি পাড় করতে ব্যর্থ হন এবং দলকে একটি মজবুত শুরুর ভিত এনে দিতে না পারেন, তবে পরবর্তী ব্যাটারদের জন্য পুরো ম্যাচে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, মর্যাদার লড়াই করতে চাওয়া বাংলাদেশের চোখ থাকবে ওপেনারদের আত্মপুনরুত্থানের প্রতীক্ষায়।